আর্টস

সত্যজিতের বয়ানে বাংলাদেশ

Satyajit Ray : wikipedia

অচিন্ত্য অর্ক

সত্যজিৎ রায় মাত্র ৫ বৎসর বয়সে মায়ের সঙ্গে প্রথম এসেছিলেন বাংলাদেশে। ১৯৭২ সালে আবারো এসেছিলেন মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আয়োজিত এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে

সত্যজিৎ রায় বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক কিংবদন্তি নাম। তিনি ১৯২১ সালের ২ মে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। প্রখ্যাত এ চলচ্চিত্রকারের পৈতৃক নিবাস কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার মসুয়া গ্রামে। যা কিনা ‘পূর্ব বাংলার জোড়াসাঁকো’ নামে খ্যাত ছিলো। বাংলা সাহিত্যের তীর্থভূমি হিসেবে স্বীকৃত এই বাড়িতে জন্মেছেন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী, শিশু সাহিত্যের আরেক অমর নাম সুকুমার রায় চৌধুরীসহ অন্যান্য যোগ্য উত্তরসূরিরা। সত্যজিৎ রায় কখনোই এ বাড়িতে আসেননি তবে পারিবারিক ঐতিহ্য তাকে প্রভাবিত করেছে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তার ছিল আত্মিক সম্পর্ক।

সংগীত শিল্পী শ্যামল মিত্র, সত্যজিৎ রায় ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
(Indian Express archive photo)

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশ ছিল সত্যজিৎ রায়ের ভালোবাসার জায়গা। মাত্র ৫ বৎসর বয়সে মায়ের সঙ্গে প্রথম এসেছিলেন বাংলাদেশে। ১৯৭২ সালে আবারো এসেছিলেন মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আয়োজিত এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে। সেদিন পল্টন ময়দানে প্রধান অতিথির প্রদত্ত ভাষণে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের প্রতি তার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। কী বলেছিলেন সত্যজিৎ বাংলাদেশ সম্পর্কে? তারই চুম্বক অংশ-

‘আমার কুড়ি বছরের চলচ্চিত্র জীবনে বিশ্বের বহু স্থান থেকে এবং আমার নিজ দেশ থেকে অসংখ্য পুরস্কার, পদক এবং সম্মান লাভের সৌভাগ্য হয়েছে। কিন্তু আজ বাংলাদেশে যে সম্মান, যে ভালোবাসা আমি পেলাম তা সবকিছুর কাছে ম্লান হয়ে গেছে। আমি কোনোদিন এই জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলব ভাবতে পারিনি। আমি বক্তা নই। আমি থাকি নেপথ্যে। ছবি আঁকি, পরিচালনা করি। আজ সকালে ঢাকায় এসে আমি যা দেখেছি তাতে আমি অভিভূত। আমি বহুদিন থেকে শহীদ দিবসের কথা শুনে আসছি। কিন্তু এখানে এসে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না আপনারা বাংলা ভাষাকে কতখানি ভালোবাসেন। ভাষাকে যে কতখানি শ্রদ্ধা করেন তা এখানে এসে বুঝতে পারছি। আমরাও পশ্চিমবঙ্গে বাংলাকে ভালোবাসি। কিন্তু আরো পাঁচটা সংস্কৃতি এসে কিছুটা প্রভাব পড়েছে সেখানে।

ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি যে, পূর্ববঙ্গ নাকি আমার দেশ। আমার ঠাকুরদাদা উপেন্দ্র কিশোর রায়ের নাম হয়তো আপনারা কেউ কেউ শুনেছেন। আমার তাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি

এখনো ইংরেজির প্রভাবই আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি পুরোপুরিভাবে। তবুও আমরা বাংলাকে ভালোবাসি। আমাদের থিয়েটার, নাটক, চলচ্চিত্র ও ছবিতে বাংলাভাষাকে বাঁচিয়ে রেখেছি। রেখেছি রবীন্দ্রনাথকে। আমার কাছে বহুবার অনুরোধ এসেছে অন্য ভাষায় ছবি করার জন্য। কিন্তু আমি প্রত্যাখ্যান করেছি তা। কারণ আমার রক্তে যে ভাষা তা বাংলা। অন্য ভাষায় গেলে আমার পায়ের তলায় মাটি থাকবে না। কূল-কিনারা পাব না। আমি ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি যে, পূর্ববঙ্গ নাকি আমার দেশ। আমার ঠাকুরদাদা উপেন্দ্র কিশোর রায়ের নাম হয়তো আপনারা কেউ কেউ শুনেছেন। আমার তাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু শিশুকাল থেকে আমি তার রচিত ছেলে ভুলানো পূর্ববঙ্গের কাহিনী টুনটুনির বই পড়ে এসেছি। ভালোবেসে এসেছি। তার রচিত গানে আমি পূর্ববঙ্গের লোকসঙ্গীতের আমেজ পেয়েছি। যদিও আমি এ দেশে আসিনি, আমার দেশে আমি কখনো আসিনি বা স্থায়ীভাবে আসিনি; এইসব গান, এইসব রূপকথা শুনলে আমার মনে হতো যে এদেশের সঙ্গে আমার নাড়ির যোগ রয়েছে। আমি আজ অত্যন্ত আনন্দিত। কোনোদিন ভাবিনি আবার কখনো দেশে আসতে পারব। অনেক দিন আগে খুব ছোটবেলায় যখন আমার পাঁচ বছর বয়স, তখন একবার এসেছিলাম আমার মায়ের সঙ্গে এই দেশে। শুনেছি আমার বাড়ি পূর্ববঙ্গে। সেই ছোটবেলায় কি দেখেছি তার অনেক কিছুই আজ আমার মনে নেই। শুধু মনে পড়ে পদ্মার ওপর স্টিমারে করে যখন আসছি আমার মা খুব ভোরে ঘুম থেকে জাগিয়ে আমাকে পদ্মার বুকে সূর্যোদয় দেখিয়েছিলেন। আর মনে পড়ে দুই নদীর মোহনার মিল দেখেছিলাম। দুটি নদী মিশে গেছে কিন্তু এর জল দু’রঙের। সেই থেকে বারবার মনে হয়েছে যে একবার নিজের দেশটা গিয়ে দেখে আসতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু সে আশা বিশেষত দেশ বিভাগের পর ক্রমেই দুরাশায় পরিণত হতে চলেছিল। হঠাৎ কিছুদিন আগে ইতিহাসের চাকা ঘুরে গেল, আমার কাছে আমার দেশের দরজা খুলে গেল এবং আজ শহীদ দিবসে এসে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে ঢাকা শহরে এসে আমার স্বপ্ন অন্তত কিছুটা অংশে সফল হলো। এবার আমি অনেক জরুরি কাজ রেখে চলে এসেছি। এবার আর বেশিদিন থাকা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু আমার ইচ্ছা আছে, আমার আশা আছে যে, অদূর ভবিষ্যতে আমি আবার এদেশে ফিরে আসব। এদেশটাকে ভালো করে দেখব। এদেশের মানুষের সঙ্গে এমনভাবে জনসভায় নয়, সামনাসামনি, মুখোমুখি বসে কথা বলে তাদের সঙ্গে পরিচয় করব। এ আশা আমার আছে।
আমি আর বিশেষ কিছু বলতে চাই না। আমার মামার বাড়ি ছিল ওয়ারীতে, র‌্যাংকিন স্ট্রিটে। সে অনেক দিন আগে। এখন র‌্যাংকিন স্ট্রিট আছে কিনা তাও জানি না। তখনকার ঢাকার কথা আমার ঠিক মনে নেই। তবে সেই এলাকার বানরের উৎপাতের কথা এখনো মনে আছে।’

খুব ছোটবেলায় যখন আমার পাঁচ বছর বয়স, তখন একবার এসেছিলাম আমার মায়ের সঙ্গে এই দেশে। শুনেছি আমার বাড়ি পূর্ববঙ্গে। সেই ছোটবেলায় কি দেখেছি তার অনেক কিছুই আজ আমার মনে নেই। শুধু মনে পড়ে পদ্মার ওপর স্টিমারে করে যখন আসছি আমার মা খুব ভোরে ঘুম থেকে জাগিয়ে আমাকে পদ্মার বুকে সূর্যোদয় দেখিয়েছিলেন। আর মনে পড়ে দুই নদীর মোহনার মিল দেখেছিলাম। দুটি নদী মিশে গেছে কিন্তু এর জল দু’রঙের। সেই থেকে বারবার মনে হয়েছে যে একবার নিজের দেশটা গিয়ে দেখে আসতে পারলে ভালো হতো।

– সত্যজিৎ রায়

সত্যজিৎ রায় প্রতিশ্রতি দেন যে, তিনি আবার আসবেন বাংলাদেশ। মিশবেন দেশের জনগণের সঙ্গে। তিনি ১৯৬৫ সনে ঢাকায় অনুষ্ঠিত চলচ্চিত্র উৎসবে তার ছবি ‘মহানগর’ সম্পর্কে বাংলার মানুষের আগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সেই ঘটনা তখন আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। আমার কাজ সম্পর্কে আপনাদের আগ্রহ আমাকে বিস্মিত করেছিল।’ শহীদ দিবসের পবিত্র তিথিতে দাঁড়িয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যিক, শিল্পী, চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় ‘জয়বাংলা’ বলে বাংলাদেশে তার প্রথম ভাষণের সমাপ্তি করেন। (সূত্র : দৈনিক বাংলা, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২/ দৈনিক ভোরের কাগজ, ২৭ এপ্রিল ১৯৯২)

পত্রিকা কাটিং – ১ , সংগৃহীত

সত্যজিৎ রায় ভেবেছিলেন বাংলাদেশকে নিয়ে চলচ্চিত্র বানাবেন। বাংলাদেশি কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের উপন্যাস ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ নিয়ে চলচ্চিত্র করার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন তিনি, ১৯৭৫ সালে। উপন্যাসটি খসড়া আকারে, গল্প হিসেবে আগে ছাপা হয় কলকাতার তরুণ সাহিত্যিকদের পত্রিকা টেরোড্যাকটিলে। সেখানেই প্রথম সত্যজিৎ গল্পটি পড়েন। এই গল্পের উপর চলচ্চিত্র নির্মাণের কথাও ভাবেন তিনি। চিঠিতে সত্যজিৎ লিখেছেন,

“প্রিয় সেলিনা হোসেন

মাননীয়াসু,

আপনার চিঠি কিছুদিন হলো পেয়েছি। আমার নতুন ছবির কাজ এবং পুঁজোর লেখা নিয়ে একান্ত ব্যস্ত থাকায় উত্তর দিতে দেরি হয়ে গেল।

‘ট্যারোড্যাকটিল’ পত্রিকায় প্রকাশিত আপনার ছোটগল্পটি পড়ে আমার যে খুব ভালো লেগেছিল তা আমি অনেককেই বলেছিলাম। গল্পটি থেকে ভালো চলচ্চিত্র হয় এ বিশ্বাসও আমার ছিল। কিন্তু তখন আমার হাতে অন্য ছবি থাকায় ওটার কথা চিন্তা করতে পারিনি। পরে বাংলাদেশে গিয়ে ছবি করার প্রশ্নে ওঠে আরেকবার; তখন শুনেছিলাম ওখানকার অবস্থা ভালো নয়, কাজে নানারকম অন্তরায়ের সম্ভাবনা আছে। সুতরাং,পরিকল্পনাটি স্থগিত থাকে।

এখন আমি আমার অন্য ছবির কাজে জড়িয়ে পড়েছি। কবে মুক্ত হব জানি না। এ অবস্থায় আপনাকেই বা কীভাবে গল্পটা ধরে রাখতে বলি তাও বুঝতে পারছি না। সংশয় হয় অন্য কারো হাতে পড়লে এমন চমৎকার গল্পটি হয়তো যথাযথভাবে চিত্রায়িত হবে না। সে বিষয় যদি (অপর পৃষ্ঠায় এরপর)
আপনি নিজে পছন্দ করে কাউকে গল্পটা দিতে পারেন তাহলে আমার কিছু বলার থাকে না। এ ব্যাপারে আপনি যা ভালো বোঝেন তাই করুন- এ আমার অনুরোধ।

আপনার সম্পাদিত পত্রিকার জন্য এর পর কোনো লেখা দিতে পারব বলে মনে হয় না। সন্দেশের লেখা এখনো লিখে উঠতে পারিনি।

আপনার গল্পটি উপন্যাসাকারে প্রকাশিত হলে পড়ার ইচ্ছে রইল।

নমস্কারান্তে ভবদীয়

পত্রিকা কাটিং- ২, সংগৃহীত

সত্যজিৎ রায়

১৩/০৮/৭৫

(সূত্র – সেলিনা হোসেন। চিঠিটি নেওয়া হয়েছে ‘আলোকিত বাংলাদেশ’ পত্রিকার ৩০ মে ২০১৪ তারিখের সংখ্যা থেকে।)

এই চিঠিতে জানানোর পরও আশির দশকে এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর চলচ্চিত্র করার কথা জানিয়েছিলেন সত্যজিৎ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি আর সেই ছবির কাজে হাত দেননি।

সত্যজিৎ রায় আজ নেই। আছে তার কর্ম ও সৃষ্টি। সমগ্র জীবন তিনি বাঙালির ভাষা, শিল্প-সাহিত্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রের উন্নয়ন ও বিকাশে কাজ করে গেছেন। হয়তো তিনি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশকেও তার মতো করে চলচ্চিত্রে দেখতে পেতাম। জয়তু সত্যজিৎ।

Video

Follow Me

Calendar

October 2020
M T W T F S S
« Jun    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031