আর্টস তারুণ্য

রকস্টার চলে গেছেন রকস্টারের মতোই

নাহিদ ধ্রুব : পরিবর্তন আমার একদম ভালো লাগে না। তবুও, প্রতিবছর শীত আসে, পাতা ঝরে , বসন্তে ফোটে নতুন ফুল। নতুন পাতা, নতুন ফুলের গন্ধে আবারও হই মোহিত । তবুও, কোথাও থেকেই যায় শুকনো পাতার জন্য একটা হাহাকার। এই হাহাকার থেকেই হয়তো জন্ম নেয় স্মৃতি, আজ যখন এই লেখাটা লিখবো ভাবছি তখন যেমন হাত পাতছি তার কাছে আর মনে হচ্ছে ডেড টেলিফোনে ফিরে আসছে ফিতা ক্যাসেটের দিন।

আমার স্মৃতিশক্তি ডানাছাড়া পাখির কাছাকাছি, খুব সচেতনভাবে চাইলেও অধিকাংশ সময়ে মনে করতে পারি না অনেককিছু। তবে, পোড়া দাগ তো যায় না সহজে। সেইসব পোড়া দাগ দেখে দেখে তবে কিছু উল্কি আঁকা যাক। ছোটবেলায় শিখতাম রবীন্দ্রনাথের গান , মা খুব শখ করে কিনে দিয়েছিলেন হারমোনিয়াম। সেই থেকেই হয়তো মিউজিকের প্রতি তৈরি হয়েছিল আসক্তি। রবীন্দ্রনাথ , নজরুল , পল্লিগীতি, লালন, হাসনরাজা, ক্যাসিকাল , আধুনিক কতো কিছুই না শিখেছি, শুনেছি, গেয়েছি। বলা যায়, একটা মিউজিক্যাল আবহে বড় হয়েছি প্রতিনিয়ত। তখন লেইট নাইন্টিজ, স্বচ্ছ বিনোদন বলতে বিটিভি। টিভিতে হুমায়ূন আহমেদের নাটক, বাংলায় ডাবিং করা অসংখ্য অসংখ্য বিদেশী সিরিজ, শুক্রবারে ৩টা বাজে বাংলা সিনেমা আর ইত্যাদি মানে তো ঈদের আনন্দ। সবকিছু ছাপিয়ে মাথার মধ্যে সবসময় চলছে মিউজিক। ভাইয়ার অবশ্য পছন্দ ছিল রক ঘরানার গান, তখন, আর্ক, এল আর বি, নগর বাউল , মাইলস, ফিডব্যাক, রেনেসা আরও কতো কতো ব্যান্ডের জয়জয়কার চলছে, চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে পরিবর্তনের হাওয়া। ভাইয়া, ফিতা ক্যাসেট নিয়ে আসতো নিয়মিত আর স্পীকারে ফুল সাউন্ড দিয়ে চলতো আমাদের উন্মাদনা। তখনও আসক্তি অতোটা গাঢ় হয়নি , গাঢ় হলো ওয়াকম্যান হাতে পাওয়ার পর, গাঢ় হলো যখন মনে হলো যে করেই হক হারমোনিয়াম ছেড়ে চলে যেতে হবে গিটারে। যেহেতু, হারমোনিয়ামকে রীতিমত তুচ্ছ করেছি তাই , আম্মু আর হাতে গিটার তুলে দিতে করেনি সাহস। তাছাড়া তখন ক্লাস এইট সামনে বৃত্তি পরীক্ষা। তাতে কী থেমে ছিল মিউজিকের প্রতি প্রেম? কতো নিষেধাজ্ঞা ছিল তখন! টিফিনের টাকা সেইভ করে, আম্মুর বালিশের নিচ থেকে টাকা চুরি করে ত্রিশ টাকা দিয়ে নিয়মিত ক্যাসেট কেনার দৌড় থামেনি তবুও। তখন বাংলা রক মিউজিকে এক স্বর্ণযুগ , প্রতিবছর পাল্লা দিয়ে বের হতো অ্যালবাম। কখনও ব্যান্ডের , কখনও সলো। প্রিন্স মাহমুদের সুরে জেমস / আইয়ুব বাচ্চার যৌথ অ্যালবাম, ক্যাসেটের একপাশে জেমস, একপাশে আইয়ুব বাচ্চুর গান। কী সব গান , প্রেম বুঝতাম না তবুও মনে হতো গানের মধ্যে যে বিরহের কথা , সে বিরহ আমার’ই, তারও অনেককাল পরে যখন জীবনে প্রথমবার প্রেমে ব্যর্থ হলাম তখন, ‘সেই তুমি’ গানের প্রাসঙ্গিকতা স্পষ্ট হয়েছিল জীবনে। আচ্ছা, নাইন্টিজের এমন কোন ব্যর্থ প্রেমিক আছে যে এই গান বিষণ্ণতায় ডুবে গিয়ে গায়নি? আমি বিশ্বাস করি না আছে।

১৮ অক্টোবর খুব সকালে আইয়ুব বাচ্চা কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন। সারারাত না ঘুমিয়ে সকালের দিকে ঘুমানোয় ঘুম ভাঙে দুপুর নাগাদ আর ফেসবুকে এসে যখন নিউজফিডে তাকালাম তখন দেখলাম কী অদ্ভুত শোকের ছায়া! কিছুতেই বিশ্বাস হয় না, ফ্রেস না হয়ে আম্মুর কাছে গেলাম, আম্মু’ও কিছু জানত না, জানলো , তারপর শুধুই নীরবতা। এই যে এখন আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে লিখছি এটাও ঐ নীরবতার একটা অংশ’ই, কীভাবে লিখবো, কী লিখলে আসলে যা বলতে চাই বলা হবে জানি না। এক জীবনে কতোবার , কতো শো দেখলাম এল আর বি’র বলে শেষ করা যাবে না। শেষবার দেখলাম ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে, ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত এল আর বি ব্যান্ডের ২৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল সেদিন। সন্ধ্যানাগাদ খবর পেয়ে চলে গিয়েছিলাম বসুন্ধরায় কোন কিছু না ভেবেই, খুব কাছ থেকে আইয়ুব বাচ্চু’কে সেই শেষ দেখা। রাত হয়ে যাচ্ছিল, বাসার গেট বন্ধ হয়ে যাবে এই ভেবে সেদিন পুরো শো’টা শেষ করতে পারিনি, ঐ হয়তো প্রথম , কোন শো শেষ না করে ফিরে আসা। যদি জানতাম, এই শেষ, আর কখনও আইয়ুব বাচ্চুকে স্টেজে বাজাতে দেখবো না তবে হয়তো।

গায়ে হলুদ, সুন্নতে খৎনা থেকে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল সে যাত্রা এতদূর আসবে তা হয়তো আইয়ুব বাচ্চু জানতেন। জানতেন বলেই কখনও পিছনে ফিরে তাকাননি। কখনও ফিলিংস, কখনও সোলস, শেষে এল আর বি’র হয়ে শাসন করেছেন নব্বই দশক। ছোট বেলায় শুনতাম, বাচ্চু ভাই নাকি এই উপমহাদেশের সেরা গিটারিস্ট। কে সেরা আইয়ুব বাচ্চু নাকি জেমস এই নিয়ে তর্ক করে খুব কাছের বন্ধুর সাথে ৬ মাস মুখ দেখাদেখি বন্ধ করেছিলাম। যেহেতু, আমি জেমসের প্রতি একটু বেশী আসক্ত ছিলাম তাই বাচ্চু ভাইয়ের গিটার বাজানোর এই তথ্য নিয়ে হাসাহাসি’ও করেছিলাম তখন। তার অনেক বছর পর, বাচ্চু ভাইকে প্রথম সামনাসামনি বাজাতে দেখি রাজউক কলেজের মাঠে, শো স্টপার হিসেবে উঠেছেন, সময় পেরিয়ে গেছে অনেক। সবাই ফিরে যাবে যাবে করছে , তখন বাচ্চুভাই গিটারে সুর তুললেন, সে এমন সুর মনে হচ্ছিল প্রবল জ্যোৎস্নায় হচ্ছে মুষলধারে বৃষ্টি, মনে হচ্ছে ঝড়ের মধ্যে ঘরে ফিরে আসছে কাকভেজা পাখি, কী উন্মাদনা, কী প্যাশনে তিনি কেবল বাজিয়েই যাচ্ছেন, বাজিয়েই যাচ্ছেন, আমরা সবাই যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে শুনলাম , গিটারে জাতীয় সংগীতের সুর বেজে উঠলো এইসবের মাঝে, কী অপূর্ব, কী অপূর্ব! ততদিনে আমার আর্টসেল, ওয়ারফেজ, ব্ল্যাক, ক্রিপটিক ফেইট, অর্থহীন প্রিয় ব্যান্ডের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে , সবার শো লাইভ দেখার হয়েছে সৌভাগ্য। তবে, সেদিন বাচ্চু ভাইয়ের সে’ই সোলো গিটার শুনে আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম , এরচেয়ে ভালো গিটার প্লেয়িং আমি লাইভ দেখিনি। তারপর, অসংখ্য বার বাচ্চু ভাইয়ের সোলো গিটারে মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছি, কখনও একটুও আসেনি ক্লান্তি।

আমি মানুষ হিসেবে যথেষ্ট মিউজিক পাগল। কানে হেডফোন ছাড়া আমাকে রাস্তাঘাটে দেখেছে, এমন মানুষ সংখ্যায় নগণ্য। এ কথা বলছি কারণ, এখনও যখন মোবাইলের প্লে লিস্ট সিলেক্ট করি, সেখানে রবীন্দ্র সংগীত, এল আর বি , নগরবাউল , আজম খান, মাইলস, আর্টসেল, ওয়ারফেজ , নেমেসিস, আরবো, মেটালিকা, গান্স এন রোজেস, পিঙ্ক ফ্লয়েড, বিটেলস, আয়রন মেইডেন পাশাপাশি থাকে।

এল আর বি কিংবা বাচ্চু ভাইয়ের শেষ অ্যালবাম আমার ভালো লাগেনি, নতুন কিছু করছিলেন না দীর্ঘদিন, তবুও তিনি যা করেছেন তারপরে আর কী কিছু করা লাগে? কোন গান ছেড়ে কোন গানের কথা বলবো, এতো হিট গান, এতো এতো ম্যাস পিপলের কাছে পৌঁছে যাওয়া কী সহজ কথা! আজ যখন এই লেখা লিখছি তখন জানি , একটা জেনারেশনকে কীভাবে প্রভাবিত তিনি করতে পেরেছিলেন, তার জানাজায় মানুষের ঢল, তার মৃত্যুতে এতো হাজার হাজার মানুষের কান্না সব মৌলিক। এটাও জানি , আমাদের পরবর্তী জেনারেশনে এমন মায়েস্ত্রো আর আসবে না। বাচ্চু ভাই, কিছুদিন আগে একটা প্রোগ্রাম করতে চেয়ে স্পন্সর খুঁজে পাননি , রাগে দুঃখে তিনি তার গিটার গুলো বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন, আমার খুব আফসোস হচ্ছে তিনি আজকের এই দিনটি দেখে যেতে পারেননি।

একটা কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি , আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, হাসান, মাকসুদ’রা না থাকলে আমরা কখনও পারতাম না আমাদের মিউজিক নিয়ে গর্ব করতে। আমাদের সুস্থ বিনোদনের পিছনে তার এই অবদান ভুলবো কী করে! আইয়ুব বাচ্চু’রা না থাকলে বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা রক মিউজিকের এতো এতো স্বর্ণালী ভাণ্ডারে কখনও গা ভাসাতে পারতাম না , নিশ্চিত। তার কাছে তো শেষ নেই ঋণের। এই ঋণ শোধ করা যাবেনা, করতেও চাই না অবশ্য। তার এই হঠাৎ চলে যাওয়া মেনে নিতে কষ্ট হলেও একটা জিনিস ভেবে ভালো লাগছে , তিনি মৃত্যুর ১ দিন আগেও স্টেজ পারফর্ম করেছেন, রকস্টার চলে গেছেন রকস্টারের মতো।

Video

Follow Me

Calendar

December 2021
M T W T F S S
« Aug    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031