অষ্ট-ব্যঞ্জণ

‘মোস্তফা ভাই’ আমাদের জীবন্ত গ্রন্থাভিধান

অলাত এহ্সান

করোনা সংকট আমাদের অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে। এ যেমন বদলে দিয়েছে নীলক্ষেতের মোস্তফা ভাইকে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আগলে রেখেছেন হাজার হাজার পুরনো বই। তুলে দিয়েছেন যোগ্য পাঠকের হাতে। তাই বইপড়ুয়াদের কাছে অন্যতম সজ্জন হয়ে উঠেন তিনি। এ করোনা সংকটে ছেড়ে দিয়েছেন নীলক্ষেতের ‘পীঠস্থান’ পুরনো বইয়ের দোকানটি

করোনায় মৃত্যুর শোক ছাপিয়ে আসছে মোস্তফা ভাইয়ের বইয়ের দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ার বেদনা। এ বেদনার একটা সমৃদ্ধি আছে। এটা রক্ত বা স্বার্থের গন্ধে ভরা নয়, অনেক বেশি চিন্তার সম্পর্ক।
অবশ্য, দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ার চেয়ে মালিকানা বদল বলাই ভাল। তিনি বইসহ দোকানটা পাশের ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। ওই ‘মালিকানা’ শব্দটি ভেঙে উচ্চারণ করলেই বেদনার মূল বোঝা যায়, মালিকানা যেন শোনায় ‌’মালী’, ‘কানা’। মোস্তফা ভাই না থাকলে ওই বইয়ের বাগানের মালীকে কানা-ই মনে হবে। কানা মালী আমাদের কি কাঙ্ক্ষিত বই দেখাতে পারবে!

‘স্বশিক্ষিত’ দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরকে একবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে নেয়া হয়েছিল, জেনেছি। দর্শনের কঠিন বিষয় অত সহজ ও সমৃদ্ধভাবে কোনো শিক্ষকও নাকি ছাত্রদের বোঝাতে পারেননি। আমার প্রায়ই মনে হতো, মোস্তফা ভাইকে কেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস রুমে অতিথি লেকচার দেয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না? তিনি তো কোনো বিষয়ের বইয়ের তালিকা অনেক শিক্ষকদের চেয়ে ভাল বলতে পারবেন। হায়! আমাদের বিসিএসধারী শিক্ষকদের সেই জাত্যাভিমান ঘুঁচাবে কে?
আমরা যারা পাঠ্যবইয়ের বাইরে আসতে চেয়েছি, মোস্তফা ভাই আমাদের গাইড (পথ প্রদর্শক) স্বরূপ; আর যারা সিলেবাসের বইটা অন্তত আগাপাশতলা পড়তে চান, তাদের জন্য শিক্ষকতুল্য। আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তার, প্রথম দেখায় বুঝে ফেলেন ক্রেতাটি কেমনতর পাঠক। তিনি সেই ভাবেই তাকে গ্রহণ করেন। বলা যায়, আগলে রাখেন।
বই অনেকেই বিক্রি করে নীলক্ষেতে, পাঠক অনুযায়ী আগ্রহ জাগানিয়া বইও তুলে দিতে পারেন নাকের সামনে, কিন্তু বইয়ের প্রসঙ্গ ধরে আরেকটা বইয়ের খবর সবাই দিতে পারে না। আমি অজস্র দিন দেখেছি, মোস্তফা ভাই ঝুঁকে বসে বই পড়ছেন। নিতান্ত ফ্ল্যাপ নয়, ভেতরের পাতা উল্টে উল্টে পড়ছেন। গল্পের চমকলাগা খটকা নয়, প্রবাহটুকুও বলতে পারেন। পরের মুখে ঝাল খাওয়ার মতো শুনে শুনে আত্মস্থ করে তা বলা যায় না, বোঝা যায়।

নিজ দোকানে মোস্তফা ভাই ; ছবি: সীমান্ত মুরাদ

নিতান্ত বই বিক্রেতা বলে মোস্তফা ভাইকে বোধ হয় আটকানো যাবে না। বরং বইপ্রেমিদের বন্ধু। একবার হয়তো তার দোকানে বই চুরি করতে গিয়ে এক পাঠক ধরা পড়ে যান। মোস্তফা ভাই তাকে কিছুটুকু না বলেই ছেড়ে দেন। তা দেখে পাশের দোকানদার তাকে তিরস্কার করছিল। তিনি বললেন, “তুমি বইয়ের কি বুঝবা, আইছাও তো চামড়া/লোহার ব্যবসা থেকে। একটা ভাল বই প্রকৃত পাঠকের চোখে পড়লে সে কোনোভাবেই তা রেখে যাবে না, পকেটে টাকা না থাকলে অনুরোধ করবে, দরকার হলে বইটা সে চুরি করবে। তাই বলে তো, ছেলেটা চোর না। চোররা কখনো বেছে বই চুরি করে না। তাদের তিরস্কার করলে শুধু অপমানই হবে। তারা খুব আবেগী হয়।” এমন শিক্ষিত, অর্থসম্পন্ন ‘চোর’ তিনি বহু দেখেছেন।
তেমন চোর নয়, মোস্তফা ভাইয়ের এখানেই কয়েকজন ‌’সিরিয়াস পাঠকের’ সঙ্গে আমার পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়েছে। এ শহরে এখনো তাদের উষ্ণতা পাই। কি করে যেন মোস্তফা ভাই-ই আমাদের সেই সংযোগ ঘটিয়ে দিয়েছেন। এদের কেউ দোকানে গেলে আরেকজনের কপাল পুড়ে, আগ্রহের বই পান না। মোস্তফা ভাইয়ের তখন আক্ষেপ ধরে না, ডেকে নিয়ে চা খাওয়ান; আর ততোধিক করুণ ভাবে বলেন- ‘ওমুক ভাই এসেছিল, আজ আর আপনি বই পাবেন না।’ তাই মনের মধ্যে মোক্ষম সময় মোস্তফা ভাইয়ের দোকানে যাওয়া তাড়না থাকতো।

ঢাকার বড় বিপনীতে নয়, প্রকৃত পাঠকরা তার কাছেই ভিড় করতেন। তিনিও যেমন, মাছের আহারের মতো জুগিয়ে রাখতেন প্রয়োজনীয় বই। মোস্তফা ভাই আমাদের সেই বন্ধু, যিনি আমাদের পাঠক করে তুলেছেন।
এমনও বহুবার হয়েছে, কলেজে গিয়েছি শুধু মোস্তফা ভাইয়ের বইয়ের আকর্ষণে। নীলক্ষেতে বইয়ের দোকান আমাদের কাছে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়। তখন ক্লাস শেষেই কাজ ছিল- হয় কলেজ সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে বসা, নয় মোস্তফা ভাইয়ের বইয়ের দোকানে যাওয়া। তেমন অনেকের সঙ্গে দেখাও হতো সেখানে। অচেনা গায়ে শীতের শুষ্কতায় ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া চেহারার কিশোরের মতো আবিষ্কার করে ছিলাম তার দোকান। তারপর কোনোদিন তার প্রতি আকর্ষণ কমেনি। হয়তো বই ঘটাঘাটি বেড়েছে, দোকানে গিয়েই সামনের স্তুপ থেকে বই কিনতে পারি না। অজস্র দিন সেলফের এখান-ওখান থেকে বই নামিয়েছি, তিনিও আন্তরিকবাবে দেখিয়েছেন। শেষে নেড়ে-চেড়ে রেখে এসেছি পছন্দ হয়নি বলে। তবু তিনি নতুন পণ্যের দোকানীর মতো পেছনে থেকে কিছু বলেননি।

এখন যেমন অনেকদিন বাদে গিয়েও বলতে পারি: মোস্তফা ভাই, আমার জন্য কি আছে? তিনি হয়তো দোকানের দৃষ্টির অসাধ্য কোণা থেকে ঠিক কয়েকটা বই বের করবেন, যা পেয়ে উচ্ছ্বসিত হব। এমনও দেখেছি, বইটি আমার আগ্রহের নয়, তবু তিনি তোলা দিয়ে সরিয়ে রাখছে কোনো এক পাঠকের জন্য। তিনি বলেন, ওই লোক আসবে, তাকে এই বই দিতে হবে।
কোনো দিন টাকার জন্য বই রেখে আসতে হয়নি তার কাছে। বরং ঋণের বোঝার মতো বইয়ের বোঝা ভারী করেই রুমে ফিরেছি। এমনটা অনেকের ক্ষেত্রেই ঘটেছে। ছাত্রাবস্থায় একবার তাকে অল্প কিছু টাকা ধার দিয়েছিলাম, সম্ভবত হাজার তিনেক। মাজার ব্যাপার হলো, তিনি এক-দেড় হাজার টাকা নগদ দিয়েছিলেন, বাকিটা বইয়ের সঙ্গে কাট দিয়েই শেষ। হা হা হা। এতে হয়তো আমাদের পারস্পারিক বিশ্বস্ততা বেড়েছিল।

প্রথম দর্শনে মনে হবে, মোস্তফা ভাই হয়তো বিরবির করে কি যেন বলছেন। কাছে কান পাতলে বোঝা যায়, তসবির মতো ওগুলো কোনো বইয়ের নাম। সারাক্ষণই বইয়ের নাম আওড়াতেন। যেন জীবন্ত গ্রন্থাভিধান। পেটে খোঁচা দিলেও দুটো বইয়ের নাম বের হবে, গালি দিলেও তাই। তাকে নিয়ে ঠাট্টা করতাম, রাতে ঘুমের ঘোরেও বইয়ের নাম বলেন না কি! ঠাট্টা আরেকটু বাড়লে বলতাম, (মুসলিম ধর্ম মতে) মরার পর কবরে ফেরেস্তারা যে তাকে তিনটি প্রশ্ন করবেন, সেখানে তিনি কোন কোন বইয়ের নাম বলবেন? তিনি হাসতেন।

প্রথম দর্শনে মনে হবে, মোস্তফা ভাই হয়তো বিরবির করে কি যেন বলছেন। কাছে কান পাতলে বোঝা যায়, তসবির মতো ওগুলো কোনো বইয়ের নাম। সারাক্ষণই বইয়ের নাম আওড়াতেন। যেন জীবন্ত গ্রন্থাভিধান

অনেকদিন পর তার সঙ্গে দেখা হলেই, চিকন গলি গলিয়ে নিয়ে যান চায়ের দোকানে। অনেক কথা লতিয়ে উঠে। হুরমুর করে এক সঙ্গে অনেক কথা বলতে গিয়ে মোস্তফা ভাইয়ের অধিকাংশ কথার বাক্য শেষ হয় না। পাঠকের প্রতি তার যত্ন ভোলার নয়। যে পথ দিয়ে ক্রেতা হয়ে উঠে তার স্বজন। এতো সত্যি, স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব কম শিক্ষকই আছেন, যারা শিক্ষার্থীদের বিস্তীর্ণ পাঠে আগ্রহ জাগাতে পারেন। মোস্তফার মতো বই বিক্রেতারা আমাদের মুখের সামনে যত্ন করে ভাল বই তুলে না দিলে আমরা হয়তো পাঠের আগ্রহই হারিয়ে ফেলতাম, অত স্বল্পমূল্যে বই না পেলে আমাদের ঘরে লাইব্রেরি গড়ে উঠতো না।
একবার গল্পকার মাসউদ আহমাদ একটা গল্পের চরিত্র হিসেবে আনলো মোস্তফা ভাইকে। প্রথম আলো’র শুক্রবারের সাময়িকীতে প্রকাশ হয়েছিল গল্পটা। পড়ে দারুণ মনে হলো, তাকে এতটুকু সম্মান দেয়ার জন্য। ওই দিনই বিকালে মোস্তফা ভাইকে প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি সব বলে দিলেন। মানে পড়েছেন। প্রকাশ করতে লজ্জা পাচ্ছিলেন। এই লজ্জাভাব এত বছরেই যায়নি। আমার মনে হয়, মোস্তফা ভাই অনেক আগেই লেখকদের বইয়ের উৎসর্গের তালিকায় উঠে গেছেন। কিন্তু কেউ তা করেছেন কিনা জানি না। ভেবেছিলাম, আমার পরের বইয়ের প্রকাশক যদি পরিবেশক হিসেবে কাউকে নিতে চান, তাহলে আমি নির্দিধায় নীলক্ষেতে মোস্তফা ভাইয়ের দোকানের কথা বলতাম।

আমি অনেকবার ভেবেছি, আমরা শহরে বইয়ের যে বিপনীগুলোর সঙ্গে পরিচিত, তাদের চেয়ে মোস্তফা ভাই অনেক সজ্জন, উন্নত মনের মানুষ। আজকাল কোনো কোনো প্রকাশককেই তো এলে-বেলে লেখকের সঙ্গে স্মৃতিকথা লিখে নিজেকে লেখকের কাতারে তুলতে চান না। কিন্তু আমার মনে হয় মোস্তফা ভাইয়ে দিয়ে একটা স্মৃতি কথা লেখানো যেতে পারে। তাতে এদেশে জ্ঞান চর্চার সংস্কৃতি ও বিস্তারের ইতিহাস পাওয়া যেতে পারে। সেই সঙ্গে লেখকদের সঙ্গে তার হিরন্ময় স্মৃতির ঔজ্জ্বল্য তো আছেই। ওই যে রক্ত শুকানো মুখের মতো যে কয়েকটা লিটলম্যাগ এখনোও নিজেদের মান দাবি করে, সাব-অল্টার্ন ভেক দেখায়, তারা অন্তত নীলক্ষেতে মোস্তফা ভাইয়ের মতো পুরনো বইয়ের যে দু-একজন ঝানু দোকানী আছেন, তাদের নিয়ে লিখতে পারতো। সে হিসেবে ‘বিপ্ল্বী’ থেকে ‘নিম্নবর্গীয়’ পাঠকের জন্য তিনি ’বাতিঘর’/‘পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র’ স্বরূপ, তবে বইয়ের বিচারে তাদের চেয়েও বড়। আর আমরা যা বই পড়তে পড়তে লিখতে আগ্রহী হয়েছি, তাদের কাছে তিনি আরো গুরুত্বপূর্ণ।

ত্রিশ বছর আগে বরগুনার কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত সমৃদ্ধ কলাপাড়া উপজেলা থেকে এসে নীলক্ষেতে বইয়ের কারবার শুরু করেছিলেন। সেই লিকলিকে মোস্তফা ভাই কয়েক প্রজন্মের বইয়ের অভিভাবকে পরিণত হয়েছেন, কিন্তু তেমনই ফিনফিনে রয়ে গেছেন। এখন গালে দাড়ি ধরেছে। তার দুই ছেলে ইউসুফ ও বিল্লাল বাবার পাশাপাশি দোকানে দাঁড়িয়েছে। বাবার মতো তারাও আমাদের ভাই হয়ে উঠেছে। হালের প্রচলনে হয়তো কেউ কেউ ‘মামু’ বলেন।
আজকে ফোনে বাপ-বেটা ভাই বলে সম্বোধন করলো। করোনার মহামারিতে তাকে শহর ছাড়তে হচ্ছে। তিনি ঝানু ব্যবসায়ী মানুষ। বইয়ের দোকান বিক্রির টাকায় এলাকায় হয়তো একটা সবজির দোকান করবেন। ফোনে কথা হলো তার সঙ্গে। তিনিও বেদনাহত। আমার মতো আরো কে কে ফোন দিয়েছিলেন, বললেন। তারাও আমার পরিচিত এবং তা মোস্তফা ভাইয়ের মাধ্যমে। তবে ভাল লাগলো তার প্রত্যাশা শুনে: করোনা-ফোরোনা যাক, আল্লাহ চায় তো একবছর পর আবার নীলক্ষেতে দোকান নিমু!

বইয়ের দোকান বিক্রির টাকায় এলাকায় হয়তো একটা সবজির দোকান করবেন

নিজ দোকানে মোস্তফা ভাই ; ছবি: সীমান্ত মুরাদ

আহ্, মোস্তফা ভাই আবার ফিরে আসুক, অন্তত আশা থাকলো মনে। আমি বললাম, আপনি চলে গেলে ঢাকায় আমার আপনজন কমে যাবে। তবে ঢাকা আসতে কোনো চিন্তা করবেন না, আমার বাসায় থাকা-খাওয়া ফ্রি। বউও না করবেনা জানি।
বিয়ের পর বউকে নীলক্ষেতে ঘুরিয়ে এনেছি। মোস্তাফা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করিয়েছি। বলেছি: ‘এই হলো, মোস্তফা ভাই, যে আমাকে ‘শিক্ষিত’ করেছেন।’ আমার মতো মোস্তফা ভাই হয়তো অনেককেই শিক্ষিত করেছেন। এই মরার দিনে লাশের পুঁদি গন্ধ এড়াতে আপনার বই বড় প্রয়োজন।
আশ্চর্য লাগে, শহরে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী মানুষ আছে, অথচ এই গৃহবন্দী সময়ে বইয়ের দোকানও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বই বিক্রির অভাবে। বিল্লালকে দেখেছিলাম, অনলাইনে বই বিক্রির চেষ্টা করতে, তাতেও সাড়া মেলেনি। যারা চাকরির অযুহাতে বই পড়তে না পারার কথা বলতেন, তারা এখন কি অযুহাত দিবেন জানি না। তাদের অযুহাতের অভাব পড়ে না। ডান-বাম হাতের চেয়ে অযুহাত চিরকালই বড় ছিল। তাহলে তারা সময় পার করছে কি করে? ভয় হচ্ছে, করোনা শেষে এক এক ঘর থেকে মানসিক বিকারগ্রস্থ মানুষ না বেরিয়ে আসে!

হয়তো আমার উচ্চাভিলাশ, তবু বলি: মোস্তফা ভাইয়ের কথা মনে পড়তো সৈয়দ মুজতবা আলীর ভ্রমণকাহিনী ‘বিদেশে’ পড়ার সময়। সেখানে একটা চরিত্র আছে, জার্মানের বন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্ররির কেয়ারটেকার উইলি। এমনিতে উইলি ছিল খিটখিটে মেজাজের, নিজে তো পড়তোই না বই, গবেষণার জন্য ছাত্ররা তার কাছে বই চাইলে রাগে গজ গজ করতো, নানা বাহানায় ঘুরাতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বিমান যখন বন বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে বোম ফেললো, তখন সেই উইলিকে দেখা গেল ছাত্রদের থিসিত পেপার, বইয়ের পাণ্ডুলিপি, পুরনো মানচিত্র রক্ষায় সবচেয়ে তৎপর। জ্বলন্ত লাইব্রেরির ভেতর থেকে ওগুলো বাইরে এনেছেন। তার স্ত্রী বাধা দিতেন, কিন্তু সে শুনেনি। তিনি বলতেন- এই আরেকবার ভেতরে যাবো, এইবারই শেষ। বলে জ্বলন্ত লাইব্রেরির ভেতর যেতেন। শেষবার লাইব্রেরির ভেতরে গিয়েছিলেন, কিন্তু বের হতে পারেননি। লাইব্রেরির ভেতর বইয়ের আগুণে প্রাণটাই দিলেন।

মোস্তফা হয়তো নিজে পাঠক নন, পাঠকদের তিনি নিতান্তই ক্রেতা মনে করতেন। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে তিনি কি মমতায় আমাদের জন্য আগলে রেখেছিলেন দুর্লভ আর স্বল্পমূল্যের বই। করোনার আগুনে তার মরণ হলো।

Video

Follow Me

Calendar

October 2020
M T W T F S S
« Jun    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031