আর্টস ইতিহাস

মোনালিসা রহস্য ও তাঁর অমর প্রেমের আখ্যান

মোনালিসা ও ভিঞ্চি। ছবি: উইকি

মুম রহমান

মোনালিসাকে চেনেন না এমন লোক পৃথিবীতে কমই আছেন। মোনালিসা চিত্রকলার ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় চিত্রকর্ম। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা ছবি মোনালিসা নিয়ে কম কথা-বার্তা হয়নি এ জগতে। মোনালিসা এমন এক শিল্পকর্ম যা নিয়ে গবেষণা হয়েছে প্রচুর।

তার নাম মোনালিসা নয়

প্রথম কথা হলো, মোনালিসা নামে যে ছবিটি আমরা চিনি তার আসল নাম মোনালিসা নয়। তার নাম লিসা ঘেরাদিনি। তিনি ছিলেন ফ্রান্সিসকো দেল গিয়োকন্ডোর স্ত্রী। স্বামীর সূত্রে তাকে লিসা গিয়োকন্ডো নামেও ডাকা হতো। যতটুকু জানা যায়, তা হলো- লিসা ঘটমট (গিয়োকন্ডো কিংবা ঘেরাদিনি— দুটো পদবীই ঘটমট) মহাশয়ার ধনকুবের স্বামী ১৫০৩ সালে লিওনার্দো ভিঞ্চিকে দায়িত্ব দিলেন লিসার একটা ছবি এঁকে দিতে।

তখন তো ক্যামেরা ছিল না, মোবাইল ছিল না, তাই পয়সাঅলা লোকেরা নিজের বা প্রিয়জনের ছবি আঁকাতেন বড় বড় শিল্পী দিয়ে। তা মোনালিসার আনুষ্ঠানিক নাম হলো লা গিয়োকন্ডো বা লা জোকন্ডে। ইতালীয় ভাষায় Monna Lisa মানে হলো ‘My Lady Lisa.’। আমার নারী লিসা থেকেই জগত-ব্যাপী সে মোনালিসা হয়ে গেলো!

শিল্পীর তুলিতে ভিঞ্চি ও মোনালিসা। Image Source: Alamy Stock Photo

অসম্পূর্ণ মোনালিসা

সকলেই জানেন ভিঞ্চি কখনোই মোনালিসাকে সম্পূর্ণ করেননি। মানে যে ছবিটি আমরা দেখি তা অসম্পূর্ণ। ভিঞ্চি কেন মোনালিসা আঁকা শেষ করেননি তা অনেকটাই রহস্যময়। কথিত আছে, ভিঞ্চি বিভিন্ন-ধরনের কাজ একসঙ্গে করতেন, ফলে কোনও কোনও কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে যেত।
আবার অন্যরকম কাহিনীও আছে। অনেকেই বলেন, লিসার প্রেমে পড়েছিলেন ভিঞ্চি। তো ছবি আঁকানোর জন্য শিল্পীর সামনে নিয়মিত বসে থাকতে হয়। এখন ভিঞ্চি যদি ছবিটা শেষ কর ফেলেন তাহলে লিসা এসে তো আর বসে থাকবে না!

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। Source: Biography Wiki

ভিঞ্চি-মোনালিসা-নেপোলিয়ন

ভিঞ্চি নাকি যেখানেই যেতেন নিজের আঁকা মোনালিসাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ন সাহেবও ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসার প্রেমে গদগদ হয়েছিলেন। ভিঞ্চি জীবিতকালে মোনালিসাকে হাতছাড়া করেননি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর মোনালিসা নানা হাতে ঘুরতে থাকে। ইতালীতে আঁকা ছবি চলে আস ফ্রান্সে।

নেপোলিয়ন ও মোনালিসা। Art By: Oliver Toovey. Source: saatchiart

১৮০০ সালে মোনালিসা ঝুলতে থাকে নেপোলিয়ন সাহেবের শোবার ঘরে। টানা চারবছর তিনি বিছানা শুয়ে এ ছবির মুগ্ধ দর্শক কিংবা প্রেমিক ছিলেন। নেপোলিয়ন শুধু মোনালিসার ছবিতেই মুগ্ধ ছিলেন না, তার প্রেম আরও বিস্তৃত হয়েছিলো। তিনি তেরেসা গোয়াদাগনি নামের এক ইতালীয় নারীর প্রেমে পড়েছিলেন। মজার কথা হলো এই তেরেসা শুধু লিসার আত্মীয়ই ছিলেন না, দেখতেও অনেকটা লিসার মতো ছিলেন!

মোনালিসার প্রেমিকগণ

লিসার প্রেমে দিওয়ানা হওয়ার ইতিহাসখানি যথেষ্ট সুদীর্ঘ। সে ইতিহাস নিয়েই একখান ‘মোনালিসা বধ’ মহাকাব্য লেখা সম্ভব। ১৮১৫ মোনালিসার ল্যুভ (আমরা যাকে ল্যুভর বলি) মিউজিয়ামে ঠাঁই পায়। তখন থেকে জানা-অজানা প্রেমিককূল ভিড় করতে থাকে। মোনালিসার প্রেমিকরা তাঁর জন্য ফুল নিয়ে আসতে থাকে, তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখতে থাকে। ল্যুভ মিউজিয়ামের সিঁড়িতে ফুল, কবিতা, চিঠি জমতে থাকে। কেউ তার ঢুলুঢুলু চোখের প্রেমে মাতোয়ারা তো কেউবা মাতাল হলেন চিকন হাসিতেই।

ল্যুভ মিউজিয়ামে মোনালিসা। Source: GETTY IMAGES

প্যারি’র (আমরা যাকে প্যারিস বলি) ল্যুভ মিউজিয়াম বিশ্ববিখ্যাত যাদুঘর। এখানে বিশ্বের বহু বিখ্যাত শিল্পকর্ম আছে। প্রায় দশ লক্ষাধিক শিল্পকর্ম এ যাদুঘরে আছে। কিন্তু মোনালিসার মতো আকর্ষণ আর কোনটিরই নেই। শুধু মোনালিসাকে দেখতেই লক্ষ লক্ষ মানুষ ল্যুভে আসেন। শুধু তাই না, মোনালিসা একমাত্র শিল্পকর্ম যার নামে লেটারবক্স আসে। মানে লোকেরা রীতিমত প্রেম নিবেদন করে মোনালিসাকে চিঠি লেখেন! তারা প্রেমের সাথে বোনাস হিসাবে তাকে তুলে নেওয়ার হুমকি ধমকিও দেন। এইসব প্রেমিকদের ভয়ে মোনালিসার জন্য আরও কড়া পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছে। আর কে না জানে, পুলিশরা যুগে যুগে প্রেমের শত্রু!

মোনালিসাকে একনজর দেখার জন্য দর্শনার্থীদের সারি; ১৯৬৩ Source: GETTY IMAGES

প্রেম অন্ধ, বন্ধনহীন। মোনালিসার প্রেমে অন্ধ, গোঁয়ার গোবিন্দ হয়েছেন কেউ কেউ। তারমধ্যে একজনের কথা বলি। এই ব্যক্তির নাম লুক মাসপেরো। তিনি নিজেও একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন। তো এ শিল্পী মোনালিসার প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে প্যারিসের এক হোটেলের চার তলার কক্ষ থেকে নিচে লাফ দিয়ে মারা যান। তার সুইসাইড নোটে লেখা ছিল, ‘বছরের পর বছর আমি ওর হাসিতে জড়িয়ে আছি। আমি বরং মৃত্যুকেই বেছে নিলাম।’ ঘটনা আরও আছে। ১৯১০ সালে এক প্রেমান্ধ মোনালিসার সামনে এলেন, তারপর পিস্তল বের করলেন, তার ইচ্ছা ছিল মোনালিসার চরণে (যদিও এ ছবিতে চরণ দেখা যায় না) নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। আহা, প্রেম!

মোনালিসা হাল্কা হলে পাতলা নয়

মোনালিসার প্রভাব বিশাল। বহু গান, কবিতা, কাহিনী লেখা হয়েছে তাকে নিয়ে। মোনালিসাকে নিয়ে ঘটনা-দুর্ঘটনাও কম না। কিন্তু এই ছবিখানা কিন্তু আকারে খুব ছোট। মাত্র ৩০/২১ ইঞ্চি ক্যানভাসে আঁকা হয়েছে পৃথিবীর আকর্ষণ-তম মুখটিকে। মোনালিসা আঁকা হয়েছে কাঠের ফলকে তেলরঙে। এর ওজন সোয়া আটকেজি প্রায়। তবে এই ছোট্ট হাল্কা ছবিখানির গুরুত্ব অপরিসীম।

মোনালিসা। Source: WIKI

Video

Follow Me

Calendar

October 2021
M T W T F S S
« Aug    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031