আর্টস

মুখোশ

নিলয় সুন্দরম

অনেকক্ষণ ধরে শুয়ে আছি। মাথার ভেতর একটা ভোঁতা যন্ত্রণা কামড় বসাচ্ছে থেমে থেমে। মোবাইলটা বেজে যাচ্ছে একটু পর পর, ধরতে ইচ্ছা করছে না। জীব বৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের সম্পর্ক বিষয়ে একটা আর্টিকেল জমা দেয়ার কথা। কিন্তু লিখবো লিখবো করেও লেখা হচ্ছে না। আসলে লেখাটা আসছে না। বই পত্র ঘেঁটে কিছু নোট নিয়ে রেখেছি, একটু ঠান্ডা মাথায় সময় করে বসলেই হয়ে যাবে। সেই বসাটাই আদতে হয়ে উঠছে না। এরকমটা আজকাল প্রায়ই হয়। দিনের মুখ জুড়ে নিঃশব্দে নামতে থাকা রাতের আঁধারের মতো দেহ মন জুড়ে একটা আলস্য বাসা বাঁধতে শুরু করেছে, আলগোছে। শোয়া থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না। মটকা মেরে চোখ বন্ধ করে পড়ে আছি। মস্তিষ্কের নিউরণ খুঁটে খাচ্ছে স্মৃতির ফ্রেম, কত শত মুখ বাঁধা পড়ে আছে সেসব ফ্রেমে। ধূসর মলিন বিবর্ণ হয়ে দেখা দিচ্ছে কেউ কেউ আবার স্পষ্টতার ভীড়ে কারও কারও মুখ একেবারেই ঝাপসা হয়ে হারিয়ে যাওয়ার প্রান্তে উপনীত, কারও মুছে গেছে নাম পরিচয়। এসব মুখের ভীড়ে হারাতে ইচ্ছে করে এখন প্রায়ই।

সুনসান নিরব একটা ক্ষীণ পায়ে হাঁটা পথ, এঁকেবেঁকে চলে গেছে বহুদূর। সেই বহুদূর, কতদূর জানা নেই। আমি হেঁটে যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি এবং কার কাছে যাচ্ছি কিছুই মনে আসছে না। হেঁটে যাচ্ছি এবং কখন থেকে হেঁটে যাচ্ছি সেটাও মনে করতে পারছি না। এটা মনে না হওয়ার সাথে শরীরে ক্লান্তি না আসাটাও একটা কারণ হয়ে থাকতে পারে। আরও একটা বিষয় হলো যে আমার কোনো ভয় বা খারাপ লাগছে না। বরং এই একলা একা হেঁটে যাওয়াটা ভালো লাগছে খুব। হাঁটতে হাঁটতে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়েছি। এই জায়গাটা আমার একেবারেই অপরিচিত, এর আগে কখনো এসেছি বলে মনে হলো না। একটা হিম ঠান্ডা শীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে, পাতলা একটা অন্ধকারে ডুবে আছে যতদূর চোখ যায়। তবে যেখানে যেখানে গাছপালা দলগতভাবে ঘন হয়ে আছে সেখানে অন্ধকারটাও ঘন হয়ে জমে আছে, ছোপ ছোপ। চোখের সীমানায় গাছপালা ভিন্ন আর অন্যকিছু চোখে পড়ছে না বলে জায়গাটাকে জঙ্গল বলেই মনে হচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে কী সব হিজিবিজি ভাবনা এসে উঁকি মেরে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে কিন্তু ধরতে পারছি না। ঋত্বিক ঘটকের কথাটা আজকাল আর মানা হয় না তেমন, ভাবনাগুলো বহুদিন ধরেই আমার প্র্যাকটিসের মধ্যে নেই। তাই তারা আর স্থিরতা পায় না কোথাও, নিঃস্পন্দ হয়ে লেগে থাকার দেয়ালগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে যে মসৃণতায় রূপ পেয়েছে সেখানে তাদের নিবিড়ভাবে লেগে থাকার সুযোগ হয়ে ওঠে না। প্রাত্যহিক জীবনে স্থিরতা আসলে এমনটা হয় কিনা আমার জানা নেই, তবে এই স্থিরতায় দিনদিন কেমন যেন অভ্যস্থ হয়ে গেছি। নিজেকে নিয়ে আজকাল আর সময় কাটানো হয় না, সময় কাটানো হয় না প্রাণ প্রকৃতি আর একান্ত নিজের কোনো ভাবনার সাথে। ইট পাথরের দেয়ালে দেয়ালে স্বপ্নের গল্প লিখতে গিয়ে আসলে নিজের গল্পগুলোই হয়ে যাচ্ছে আমিহীন। সেই আমিহীন গল্পে আমার ছোঁয়া নেই, প্রাণ নেই, রঙ নেই তবু মাকড়শার জাল হয়ে সেগুলো আমাকেই ঘিরে থাকে। মাঝে মাঝে দেয়ালবন্দী জীবনে কোনো আলো আঁধারি জোছনার রাতে এক কাপ চা হাতে ব্যালকনিতে বসে চুমুকে চুমুকে ভাবনার রোমান্টিসিজম উপভোগ্য হলেও জীবনের কঠিনতম ভাবনা কেবল জীবন ঘনিষ্ঠ হলেই ভাবা যায়। তবু এলোমেলো কিছু কথা মাথায় এসে জট পাকিয়ে যায়, যখন তখন। প্রভু ভক্তিতে বা বিশ্বস্ততায় কুকুরকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না যে মানুষ হিংস্রতায় নিজেকেই নিজে ছাড়িয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন।

এসব টুকরো টুকরো কথা যখন মনে আসছে তখন একটা পাখি ডানা ঝাপটে নিজের বাসা থেকে উড়ে গেল। যেতে যেতে কাকে কি যেন একটা বলে গেল। আমি যেন একটু একটু বুঝতে পারলাম কথাটা। কিন্তু বুঝতে পারাটা বিশ্বাস করতে পারছি না বলে কথাটা পুরোপুরি ধরতে পারিনি। আমি চকিতে থমকে দাঁড়ালাম। একটা চুপিচুপি ফিসফিসানি কানে আসছে। কারা যেন কথা বলে যাচ্ছে, অল্প অল্প খুচরো আলাপের সাবধানী কথা। একজন আরেকজনকে কোনো খবর পৌঁছে দিচ্ছে যেন। সাবধানী হয়ে আবারও কান পাতলাম। স্পষ্ট করে বাজলো এবার, ফিসফিসানিগুলো বোধগম্য অর্থবোধক ধ্বনি হয়ে ধরা দিলো ‘ওই দেখ মানুষ, একটা মানুষ, একলা মানুষ।’ আমার নিশ্বাস একটু ঘন হয়ে এলো। নিজেকে এখন সত্যিই খুব একা লাগছে। যেই একাকিত্বটা এতক্ষণ উপভোগ্য ছিলো সেটা ধীরে ধীরে হারাতে শুরু করছে। ‘কে কথা বলে এমন? কারা কথা বলে এমন? ভয়ে জড়সড় সাবধানী কথা!’ দাঁড়িয়ে থেকেও কেমন ক্লান্তিবোধ করতে শুরু করেছি। কোথা থেকে হাঁটা শুরু করেছিলাম মনে করার চেষ্টা করলাম আবারও। মনে পড়ছে না। বাসার ঠিকানা ও নিজের পরিচয় কিছুই মনে করতে পারছি না। আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি। নিজের নামটা পর্যন্ত মনে পড়ছে না আমার। নিজের পকেট খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, আমি অনাবৃত দিগম্বর এক। ছুটে পালাতে ইচ্ছে করছে এখন। হঠাৎ ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ছে প্রায়। মুহুর্তেই সব শক্তি যেন শুষে নিয়েছে কেউ। নিজেকে একপ্রকার টেনে নিয়ে পাশেই পড়ে থাকা মৃত একটা গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে বসলাম। নিচে চাপা পড়া কারও আর্তনাদ স্বস্তি দিলো না। আমি আরেকটু কষ্ট করে পা তুলে গাছের গুড়িটাতেই বসলাম। মৃত প্রাণের কান্নার অধিকার কেড়ে নেয় কেউ অথবা সে কান্না হয় কম্পনহীন কোনো কম্পাঙ্কে, যার হয়তো কোনো শব্দ তরঙ্গ তৈরির ক্ষমতা থাকে না।
এসব ভাবতে ভাবতে চেতনা হারিয়েছিলাম কিনা জানি না, তবে ফিসফাসের আওয়াজগুলো আরও অধিক স্পষ্ট হয়ে চারপাশ মুখরিত করলে আমি চোখ মেলি। চোখের সামনে কিছু আলাদা আলাদা অবয়ব আকৃতি নিয়ে ধরা দিতেই আমি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে অসহায়বোধ করতে শুরু করেছি। অবয়বগুলোর মধ্য থেকে কোনো একজন আমাকে স্পষ্টত আমারই ভাষায় অভয় দিয়ে আশ্বস্ত করে আমাকে স্বাভাবিক হতে অনুপ্রাণিত করলেও বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছি না।

কোনো ভয় বা খারাপ লাগছে না। বরং এই একলা একা হেঁটে যাওয়াটা ভালো লাগছে খুব। হাঁটতে হাঁটতে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়েছি

একই সাথে আহ্বান জানাই নিজেদের আবিষ্কৃত প্রতিবিম্ব দেখা যন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের চেহারা ঘষে দেখুন, সেটা আপনাদের মুখ নাকি মুখোশ

আমি দেখতে পাচ্ছি আমার চারপাশে জড়ো হয়েছে কয়েক প্রজাতির সাপ, শেয়াল, হায়েনা, কুকুর ও বেড়াল। নিজের বিশাল আকৃতি নিয়ে কয়েকটি চিতার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটি হাতি, রাজকীয় ভঙ্গিমায় তার কাছাকাছিই বসে আছে একটি সিংহ। দুটি শাবকসহ নিজের পরিবার নিয়ে এসেছে বাঘ। নিজের একান্ত মনিব মনে করে আমার একেবারে গাঁ ঘেঁষে বসে জাবর কেটে চলেছে একটি গরু আর তার অনতিদূরে নিরীহ ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে একটি গাধা। একেবারেই আমার পায়ের কাছে বসে আছে একটি করে ইঁদুর ও গিরগিটি। আরও অনেক অনেক নাম না জানা প্রাণির এক সম্মিলনে বসে আছি, ঘোরগ্রস্থ আমি। কী হতে চলেছে, কী হবে, কেন এই আয়োজন বুঝার চেষ্টা করছি। সবার শান্তশিষ্ট ভঙ্গীও আমার ভয় পুরোপুরি কাটাতে পারছে না, একটু একটু করে ঘেমে উঠছি আমি, ইতোমধ্যেই। অথচ গাছের পাতায় পাতায় লেগে থাকা পাতলা অন্ধকারটা লেগে আছে এখনো। দোলনায় রেখে ছোট্ট শিশুকে ঘুম পাড়ানোর মতো করে পাতাগুলোকে দোলাতে দোলাতে খেলা করে যাচ্ছে ঝিরঝিরে একটা বাতাস। আর সে বাতাসে চড়ে সম্মিলন জুড়ে মৌমাছির ডানা ঝাপটানোর শব্দের মতো একটা মৃদু গুঞ্জন ভেসে বেড়াচ্ছে যখন, ঠিক তখনই সবাইকে থামিয়ে দিয়ে ভরাট ও স্পষ্ট উচ্চারণে ঠাকুর মা’র ঝুলি থেকে উঠে আসা গল্পের মতো কথা বলে উঠলো সিংহ- ‘এতক্ষণ সকলের বক্তব্য থেকে যে সার বক্তব্যটি লেখা হয়েছে তা সবাইকে পড়ে শুনানোর জন্য এবং পড়া শেষে কাগজটি যথাযথ প্রতিনিধিকে হস্তান্তর করার জন্য আমি শেয়ালকে অনুরোধ করছি।’

আমার আর বুঝতে বাকি থাকে না যে এখানে আগে থেকেই একটা সম্মিলন বা সভা হচ্ছিলো কিন্তু আমি সেখানে আহূত না অনাহূত তা বুঝতে পারলাম না। তবে এটুকু বুঝলাম যে সামনে আরও অনেক কিছুই বোঝার বাকি। ইতোমধ্যেই সিংহের কথা মতো শেয়াল তার লেজটিকে নিচের দিকে মেলে দিয়ে পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে সামনের দুই পা’কে হাত হিসেবে ব্যবহার করে কাগজটি মেলে ধরে আমাকে সম্মুখে রেখে কোনো প্রকার ভূমিকা ছাড়াই পড়তে শুরু করেছে-
‘সভ্যতার ঝান্ডাধারীদের ভদ্র সমাজে আজও গালি হিসেবে আমাদের কয়েকজনের নাম ব্যবহার করা হয়ে থাকে নিতান্ত অবজ্ঞায়, তাতে আমাদের দুঃখ থাকলেও লজ্জা নেই। সৃষ্টির পূর্ব থেকে মৃত্যুর পর পর্যন্ত আমাদের শত শত উপকার ভোগ করেও বিভিন্ন সময়ে আমাদেরকে হিংস্র, বিষাক্ত ও বর্বর জানোয়ার হিসেবে চিহ্নিত করে যে অকৃতজ্ঞ নির্লজ্জ প্রজাতি তাদের বিরুদ্ধে এমন করে সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ করার চিন্তা আমরাও এতদিন এড়িয়ে গেছি, নিতান্ত অবহেলায়। কারণ জন্মগতভাবে প্রাকৃতিক বা প্রজাতিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে আত্মরক্ষার প্রয়োজনে নিরুপায় হয়ে বিভিন্ন সময়ে আমাদের কাউকে কাউকে এসব হিংস্রতা, বিষাক্ততা ও বর্বতার কৌশল অবলম্বন করতে হয় বৈকি, যা একেবারে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, যেসব কর্মকান্ডের সাথে আমাদের বিন্দুমাত্র যোগাযোগ নেই এবং যেসব জঘন্য কর্মকান্ড আমাদের দূরতম কল্পনাতেও আসে না, আজকাল তাদের সেসব কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে হয়ে যাচ্ছে আমাদের নাম। তাদের একেকজন আমাদের কয়েকজনের চরিত্র ধারন করে তাদের সেই তথাকথিত সভ্য সমাজে বসবাস করে ঘৃণিত ও জঘন্য কর্মকান্ড করে আমাদের চরিত্রে যে কলঙ্ক দিচ্ছে আমরা তার তীব্র ও ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ জানাই। একই সাথে আহ্বান জানাই নিজেদের আবিষ্কৃত প্রতিবিম্ব দেখা যন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের চেহারা ঘষে দেখুন, সেটা আপনাদের মুখ নাকি মুখোশ।’

আরও কি কি যেন পড়া শেষ করে শেয়াল নিজে এগিয়ে এসে আমার হাতে কাগজটা ধরিয়ে দিয়েছে, আমি স্তম্বিত ও হতভম্ব হয়ে বসে আছি আর ঘামছি। মুক্ত ঝিরঝিরে বাতাসে থেকেও আমার ফুসফুসে কোনো বাতাস নেই।

আমি প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করার এক পর্যায়ে আমার ঘুম ভেঙে গেল। ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে বিছানায় উঠে বসে সাইড টেবিলে রাখা গ্লাসের সবটুকু পানি এক চুমুকে শেষ করে দেখি আমার বাঁ হাত এখনো শেয়ালের বাড়িয়ে দেয়া কাগজটা ধরে আছে। আর গ্লাস ছেড়ে অন্য হাতটা আমার গাল ঘষছে।

Video

Follow Me

Calendar

October 2020
M T W T F S S
« Jun    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031