জীবজগৎ

মাছ নিয়ে যতো কথা

source by Earth Blog

জাবেদ আয়েন্দা : আমাদের বলা হয় ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড়ের এদেশে বোধহয় সেই আদিযুগ থেকেই মাছ খাওয়া হতো। তবে মাছ নিয়ে আমাদের কৌতুহলের শেষ নেই। চলুন মাছ নিয়ে কিছু আশ্চর্জযনক তথ্য জেনে কিছু কৌতুহল মেটানো যাক:

১. মাছ সাধারণভাবে জলজ প্রাণী। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় মাছ বলতে বোঝায় ঠাণ্ডা রক্তের জলজ মেরুদণ্ডী প্রাণী।

২. মাছের মাথার দু’দিকে কানকো ঢাকা ফুলকা থাকে। এ ফুলকার সাহায্যে শ্বাসপ্রশ্বাসের কাজ করে। জলের ভেতর জলে মিশে থাকা অক্সিজেন নেওয়ার ক্ষমতা এদের আছে। কারও কারও বাতাসে থাকা অক্সিজেন নিয়ে অনেকক্ষণ বেঁচে থাকার ক্ষমতাও আছে।

৩. মাছের শরীরের মধ্যে বাতাসের থলি থাকে। এ থলির সাহায্যে এরা জলের মধ্যে ভেসে থাকতে পারে।

৪. মাছের শরীরের বাইরে অনেকগুলো পাখনা থাকে। পাখনাগুলোতে রশ্মির আকারে কাঁটা আছে। যেগুলো সারাজীবন থাকে এবং যার সাহায্যে মাছেরা নানা কাজ করে। যেমন- চলাফেরা, সাঁতার কাটা, দিক পরিবর্তন ও শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা ইত্যাদি।

৫. পৃথিবীতে আনুমানিক বত্রিশ হাজার বিভিন্ন প্রকারের মাছ আছে।

৬. মাছ হলো পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রাণী। পৃথিবীতে যখন ডায়নোসোর বিচরণ করতো তার অনেক আগে থেকেই মাছের অস্তিত্ব ছিলো। ধারণা করা হয়, পৃথিবীতে মাছ আছে ৪৫০ মিলিয়ন বছর ধরে।

৭. মাছেরাও পানিতে ডুবে মরতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলেন, যদি পানিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন দ্রবীভূত না থাকে তাহলে মাছ সত্যিই ডুবে মারা যায়।

৮. মাছের সমস্ত শরীরেই স্বাদ কুঁড়ি বা ‘টেস্ট বাড’ থাকে। তাই এরা মুখ ব্যবহার করা ছাড়াও স্বাদ নেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

৯. বাঙালির প্রতিদিনের নানা কথায়ও মাছ জড়িয়ে আছে। মাছ নিয়ে আছে বুদ্ধিদীপ্ত কথা, চটুল মন্তব্য, প্রবাদ-প্রবচন ও বাগধারা। এমন কতোগুলো হলো- ‘রাঘব বোয়াল’, ‘গভীর জলের মাছ’, ‘মাছের মা’, ‘মাছের তেলে মাছ ভাজা’, ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’, ‘ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না’ ও ‘মাছের মায়ের পুত্রশোক’ ইত্যাদি।

১০. বাঙালির বিয়েবাড়িতে কিংবা গায়ে হলুদে রুই মাছ সাজিয়ে পাঠানো শুভাশীষের প্রতীক। বাঙালির সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হলো মাছ। বাঙালির মৎস্যপ্রীতির পরিচয় পাওয়া যায় সংস্কৃতির নানা প্রকাশে- আলপনায়, শাড়ির পাড়ে, আঁচলে, কানের দুলে, গলায় হারের নকশায় অথবা লকেটে। বাঙালির মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে মাছ না হলে চলেই না।

১১. মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর রুই মাছ খুব পছন্দ করতেন। তার আত্মজীবনী হলো ‘তুজুক’, সেখানে তিনি লিখে গেছেন যে, মালব থেকে গুজরাটে যেতে পথে সর্দার রায়সান তাকে একটা বড় রুই মাছ দেন। বহুদিন পর একটি ভালো রুই পেয়ে বাদশা এতো খুশি হলেন যে, তখনই তিনি সর্দারকে একটি ভালো ঘোড়া উপহার দিয়ে দেন।

১২. মাছ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে রয়েছে নানা ছড়া, কবিতা ও গল্প। বাংলা উপন্যাসে রয়েছে মাছ, মাছ ধরা ও জেলেদের জীবন নিয়ে নানা কাহিনী। কবি ঈশ্বর গুপ্ত লিখেছেন, ‘ভাত-মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙ্গালি সকল/ ধানে ভরা ভূমি তাই মাছ ভরা জল।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেন, ‘খেঁদুবাবুর এঁধো পুকুর, মাছ উঠেছে ভেসে/ পদ্মমণি চচ্চড়িতে লঙ্কা দিল ঠেসে।’

১৩. ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী বাঙালির অন্যতম ব্যঞ্জন বা তরকারি হিসেবে মাছ রাঁধার চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন- ‘কৈ ভাজে গণ্ডাদশ মরিচ গুঁড়িয়া আদারসে’।

১৪. পশ্চিমবাংলার চন্দ্রকেতুগড়ে পাওয়া পোড়ামাটির ফলকে মাছ উৎকীর্ণ রয়েছে। গবেষকদের ধারণা ফলকটি চতুর্থ শতকের হতে পারে। অষ্টম শতাব্দী থেকে বাংলাদেশের পাহাড়পুর ও ময়নামতিতে যেসব পোড়ামাটির ফলক মাটি খুঁড়ে বের করা হয়েছে, তার বেশ কয়েকটিতে মাছের ছবি দেখা যায়। কোনো কোনো মন্দির থেকে এমনকি বঁটি দিয়ে মাছ কোটা বাঙালি রমণীর দৃশ্যসংবলিত পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে। মাছ যে বাঙালির একটা অতি প্রাচীন জনপ্রিয় খাবার, এ ফলকগুলো তারই পরিচায়ক।

১৫. পানিতে কিছু মাছের অনবরত সাঁতার কাটতে হয়। যেমন হাঙ্গর ও আরও কিছু মাছের বায়ুথলি নেই। এজন্য এরা অনবরত সাঁতার কাটে অথবা পানির তলায় গিয়ে বিশ্রাম নেয়।

১৬. স্তন্যপায়ী ও পাখিদের মতো মাছেরাও ব্যথা ও চাপ অনুভব করে। মাছের স্পর্শ অনুভূতি, স্বাদ অনুভূতি ও দৃষ্টিশক্তি আছে। আবার কিছু মাছের শোনার ও গন্ধ শোঁকারও অনুভূতি থাকে।

১৮. অনেক লিপস্টিক তৈরিতে ব্যবহার করা হয় মাছের আঁশ।