অষ্ট-ব্যঞ্জণ ইতিহাস ট্রাভেল

বাংলাদেশের আলোচিত ১০টি ভুতুড়ে জায়গা

image: সুমাইয়া জাহান

সাইদ রহমান

ভূত-প্রেতের কোনো অস্তিত্ব নেই। তবু শত শত রহস্যজনক জায়গা আছে। সে সব জায়গা সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো ধারণা না থাকায় মানুষের মনে কৌতূহল জাগে। বাস্তবে হয়তো কখনো কখনো জনশ্রুতিতেই গড়ে ওঠে এমন অনেক ভুতুড়ে বাড়ি বা জায়গা। কোনোটায় বা থাকে অনুদ্ঘটিত কোনো রহস্য, যা এই জায়গাগুলোকে ঘিরে তৈরি করে ভুতুড়ে আবহ। এ ধারণার বাইরে নেই বাংলাদেশও। বাংলাদেশের নানা প্রান্তেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা ভৌতিক জায়গা, যা নিয়ে গা ছমছমে গালগল্প চলছে।

লালবাগ কেল্লা

source: ittefaq

মুঘল আমলে তৈরি রাজধানী ঢাকার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র লালবাগ কেল্লা সম্বন্ধে কমবেশি সবার জানা। এর নিচ দিয়ে অনেক সুড়ঙ্গ আছে, যেগুলো জমিদার আমলে করা। জমিদাররা বিপদ দেখলে সেইসব পথে পালিয়ে যেতেন। তেমনই একটা সুড়ঙ্গ আছে, যার ভেতরে কেউ ঢুকলে তাকে আর ফিরে পাওয়া যায় না। মানে, সে আর ফিরে আসে না। ব্রিটিশরা একবার পরীক্ষা করার জন্য একবার ২টা কুকুরকে চেইনে বেঁধে সেই সুড়ঙ্গে নামানো হয়েছিল। চেইন ফেরত আসে কিন্তু কুকুর দুটো ফিরে আসেনি।
সুবেদার আজম শাহ ১৬৭৮ সালে ঢাকায় একটি প্রাসাদ দুর্গ নির্মাণে হাত দেন। তখন ঢাকার সুবেদারদের থাকার জন্য স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা ছিল না। স্বল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করতে আসা সুবেদাররা ঢাকায় স্থায়ী ভবন নির্মাণে কোনো উৎসাহ দেখাননি।

যুবরাজ আযম শাহ প্রথম এই উদ্যোগ নেন। তিনি অত্যন্ত জটিল একটি নকশা অনুসরণ করে দুর্গের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। নামকরণ করেন কিল্লা আওরঙ্গবাদ। কিন্তু পরের বছর সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে দিল্লি ফেরত পাঠান। ফলে দুর্গের কাজ অসমাপ্ত রেখে তাকে দিল্লি চলে যেতে হয়। এরপর সুবেদার হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা আসেন শায়েস্তা খাঁ। যুবরাজ আযম শাহ তাকে লালবাগ দুর্গের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য অনুরোধ করেন। শায়েস্তা খাঁ দুর্গের কাজ পুনরায় শুরু করেন। কিন্তু ১৬৮৪ সালে তার অতি আদরের মেয়ে পরি বিবি অকস্মাৎ মারা গেলে তিনি অশুভ মনে করে এর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন।
এর পরিবর্তে নির্মাণ করেন চিন্তাকর্ষক পরি বিবির সমাধিসৌধ। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে লালবাগ দুর্গের প্রায় ১২ শতাংশ নির্মাণকাজ শেষ হয়ে এসেছিল। দুর্গের নিয়ম অনুযায়ী একটি ভূগর্ভস্থ পথও নির্মিত হয়েছিল। আত্মরক্ষা প্রয়োজনেই এ পথ ব্যবহৃত হতো। দুর্গের দক্ষিণ-পূর্ব দেয়ালের সঙ্গে যুক্ত আছে এ সুড়ঙ্গ পথটি। কোনো কোনো স্থপতির ধারণা, এ পথটি প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে টঙ্গী নদীর সঙ্গে যুক্ত। আবার কেউ মনে করে, এটি একটি জলাধারের মুখ।
এর ভেতরে একটি বড় চৌবাচ্চা আছে। মোগলদের পতনের পর লালবাগ দুর্গ যখন সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়, তখন ঢাকাবাসীর সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এই সুড়ঙ্গ। আর তখন থেকেই নানা মুখরোচক কাহিনী চালু হয় সুড়ঙ্গটি নিয়ে। যেহেতু সুড়ঙ্গ পথের রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য আজ পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ হয়নি, তাই এটি নিয়ে এখনও নানা কল্পকাহিনী চালু আছে।

ফয়’স লেক

Foys lake. Image sourc: Dhaka Tribune

সৌন্দর্য ও বিনোদনের জন্য ফয়’স লেক একটি প্রসিদ্ধ নাম। তবে নজরকাড়া সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে ফয়’স লেক ঘিরে নানান রকম গল্প প্রচলিত আছে। প্রায়ই শোনা যায় এখানে সাদা ও কালো পোশাক পরিহিত দুই রহস্যময় নারী ঘোরাফেরা করে। স্থানীয় মানুষের মতে, ফয়’স লেকে এই দুজন নারীর মৃত্যু হয়; কিন্তু তাদের অতৃপ্ত আত্মা লেক ছেড়ে কখনো যায়নি। লেকের পুরনো পাশটাতে তারা বাস করছে কয়েক শতাব্দী ধরে।
কালো পোশাক পরিহিত নারীটি হুটহাট সন্ধ্যার সময় লেকের পাশে হন্টনরত মানুষের সামনে এসে ভয় দেখায়। ধারণা করা হয় জীবদ্দশায় কালো পোশাক পরিহিতা নারীটি ভালো মানুষ ছিল না। সাদা পোশাক পরিহিতা নারীটি সেই তুলনায় বেশ ভালোই বলতে হয়। কেননা কালো পোশাক পরিহিতার মাধ্যমে বিপদে পড়তে যাওয়ার আগে সে মাঝে মাঝে মানুষকে সাবধান করে দিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত এই ভুতুড়ে কালো ছায়ার সম্মুখীন হতে হয়েছে অনেককেই! তবে এসব গল্পের এখন পর্যন্ত কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি কিন্তু প্রচলিত ভুতুড়ে গল্পগুলো ফয়’স লেককে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।

গানস অব বরিশাল

গানস অব বরিশাল image source: globalsecurity.org

ঊনবিংশ শতাব্দীতে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বরিশাল এলাকায় বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বিকট শব্দ শোনা যেত। ব্রিটিশরা বরিশালে আসার সময় এর নাম ছিল বাকেরগঞ্জ। বাকেরগঞ্জের তৎকালীন ব্রিটিশ সিভিল সার্জন প্রথম ঘটনাটা লেখেন। বর্ষা আসার আগে আগে গভীর সাগরের দিক থেকে রহস্যময় কামান দাগার আওয়াজ আসত। ব্যাখ্যা করা যায় না এমন শব্দগুলোকে একত্রে বলা হয় মিস্টপুফার্স। বরিশালের মতো ভারতের গঙ্গা নদীর তীর, যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, স্কটল্যান্ড, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, জাপান, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, উত্তর সাগরসহ আরও কিছু এলাকায় এ ধরনের শব্দ শোনা গেছে।
১৮৭০-এর দিকে প্রথমবারের মতো বরিশাল গানসের কথা নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা যায়। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই এটি শোনা যেত বলে নথিপত্রগুলোতে উল্লেখ করা হয়। ১৮৮৬ সালে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির হিসাব অনুযায়ী খুলনা, বরিশাল, নোয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ, হরিশপুর প্রভৃতি স্থানে বরিশাল গানস শোনা গেছে। বরিশাল গানস কেবল গাঙ্গেয় বদ্বীপ নয়, ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপেও শোনা গেছে। যেসব বিকট শব্দ শোনা যেত তার সঙ্গে ঢেউয়ের শব্দের চেয়ে কামানের গোলা দাগার শব্দের বেশি মিল ছিল। কখনো কখনো একবার শব্দ শোনা যেত, আবার কখনো দুই বা তিনবার শব্দ একসঙ্গে শোনা যেত। দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল থেকে শব্দগুলো বেশি শোনা যেত।
প্রথম দিকে ব্রিটিশদের ধারণা ছিল শব্দগুলো জলদস্যুদের কামান দাগার আওয়াজ; কিন্তু বহু খোঁজাখুঁজি করেও কোনো জলদস্যু জাহাজ বা ঘাঁটির খোঁজ পাওয়া যায়নি। কবি সুফিয়া কামাল তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তার শৈশবে এ ধরনের রহস্যময় বিস্ফোরণের শব্দের কথা তিনি মরুব্বিদের কাছে শুনেছেন। তার কথায়, ১৯৫০-এর পরে কখনো এই শব্দ আর কেউ শুনেছে এমন কথা তিনি শোনেননি। বরিশাল গানস প্রকৃতপক্ষে কীভাবে উদ্ভূত হয় সে সম্পর্কে বেশ কয়েকটি প্রকল্প অনুমান করা হয়েছে, তবে এদের কোনোটিই প্রমাণিত হয়নি। ভূমিকম্প, বজ্রপাত, মোহনায় ঢেউয়ের ধাক্কা প্রভৃতির সঙ্গে এর তুলনা করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ ধারণা করেন সাগরে কোনো গ্যাস ফিল্ড অথবা কোনো মৃত আগ্নেয়গিরির শব্দ। যেহেতু কোনো প্রমাণ মেলেনি তাই এটা এখনো রহস্য হিসেবেই রয়ে গেছে।

খুলনার ভূতের বাড়ি

খুলনার ভূতের বাড়ি image source : UNB

বাড়ির দুজন বাসিন্দা আত্মহত্যা করেছেন। যে কারণে অন্যরা বহু আগেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। সেখানে এখনো রাতে নারী কণ্ঠের খিলখিল হাসির শব্দ শুনতে পান অনেকে। আবার কখনো অশরীরী ছায়ামূর্তিও দেখেছেন বলে অনেকের দাবি। সব মিলিয়ে শহরবাসীর কাছে পরিত্যক্ত এই বাড়িটি ‘ভূতের বাড়ি’ নামে পরিচিত। খুলনা শহরের খানজাহান আলী রোডের টুটপাড়া কবরস্থানের পাশে এই বাড়ির অবস্থান।
কথিত আছে, রাজা দয়ারামের এক ভাগিনির নাম ছিল শীলা। তিনি রাজার তহসিলদার অমূল্য ধনের পুত্র নিশিকান্তের প্রেমে পড়েন। দুজন পালাতে গিয়ে ধরা পড়েন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার আগেই দ্রুত বিয়ে দেওয়া হয় শীলা রানীকে নিধুরাম নামের এক যুবকের সঙ্গে। শীলা রানী ও নিধুরামকে উঠতে হয়েছিল পরিত্যক্ত এই ভূতের বাড়িতেই। শীলা নিধুরামের সঙ্গে এলেও তাকে স্বামী হিসেবে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেননি। এজন্য তার দেহ তিনি নিধুরামকে স্পর্শ করতে দেননি। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ বাড়তে থাকে। এক রাতে শীলা আত্মহত্যা করেন। শীলার পরিণতি দেখে নিধুরামও আত্মহত্যা করেন। সকালে ঘরে দুজনের লাশ দেখে চাকর-বাকরও ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। একপর্যায়ে ভবনটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এই থেকেই বাড়িটি নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হতে থাকে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই ভূতের বাড়ি। মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তা করার জন্য জামায়াতে ইসলামী নেতা মাওলানা এ কে এম ইউসুফ একাত্তরের মে মাসে এই বাড়িতে ৯৬ জন জামায়াত যুব ক্যাডার নিয়ে রাজাকার বাহিনী গড়ে তোলেন। শোনা যায় ‘রাজাকার’ নামটি তিনিই দিয়েছিলেন। এটাই ছিল একাত্তরের প্রথম রাজাকার ক্যাম্প। ভূতের বাড়িটি বর্তমানে আনসার ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এতকিছু ঘটে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ ভবনটি সম্পর্কে ভীতিকর ধারণা পোষণ করে। কবরস্থানের পাশে হওয়ায় এই ভীতি আরও বেড়ে গেছে।

পার্কি বিচ

পার্কি বিচ

লম্বায় প্রায় ১৫ কিলোমিটার; ৩০০-৩৫০ ফিট চওড়া এবং ২০ কিলোমিটার ঝাউবনযুক্ত এই সৈকতটি অত্যন্ত নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অধিকারী। এই অনিন্দ্যসুন্দর সমুদ্র সৈকতকে ঘিরেও প্রচলন আছে ভৌতিক কাহিনীর। প্রথমত, সেখানে কিছু এলাকায় অদ্ভুত পদশব্দ, চিৎকার ও ভুতুড়ে আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। অনেক পর্যটক ও স্থানীয় ব্যক্তি কৌতূহলবশত অনুসরণ করে এসব শব্দের উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেও প্রকৃতপক্ষে কোনো উৎসই খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেক সময় মনে হয় শব্দগুলো পানির ভেতর থেকে আসছে। আবার কখনো সেটি পার্শ্ববর্তী বন থেকে আসছে বলে মনে হয়।
শব্দগুলো যেনো কৌতূহলী মানুষকে পানিতে টেনে নিয়ে যেতে চায়। সেখানে পর্যটক হিসেবে আগত এক দম্পতির মতে, বিচে সূর্যাস্তের পর সান্ধ্যকালীন ভ্রমণের সময় তাদের দুজনেরই মনে হচ্ছিল কোনো অশরীরী তাদের ওপর চোখ রাখছে। তাদের এই অনুভূতি তাদের থাকার স্থানে ফেরার আগ পর্যন্ত হয়েছে। এছাড়াও গভীর সাগরে নৌকাসহ এক বুড়ো নাবিকের দেখা মেলে। কখনো একজনের আবার কখনো বা অনেককে তাদের নৌকা নিয়ে গভীর সাগরে যেতে দেখা যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এরা কেউই মানুষ না। ধারণা করা হয় সাইক্লোনের সময় নৌকা পাড়ে ভেড়াতে ব্যর্থ হওয়া যে সব নাবিক মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তাদেরই আত্মা এখনো নৌকোসমেত মাঝ সাগরে পাড়ি জমায়। যদিও এ সব ঘটনার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবুও অনেক পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের দাবি তারা এগুলো চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেছেন।

চিকনকালা গ্রাম

চিকনকালা গ্রাম image source: nobbotrekker

মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা বাংলাদেশের অন্যতম উঁচু আর সবচেয়ে দুর্গম গ্রামগুলোর একটি ‘চিকনকালা’। এ অঞ্চল একদমই যেন পৃথিবীর বাইরে। মুরং সম্প্রদায়ের এই গ্রামটির অবস্থান বাংলাদেশ-বার্মা নো-ম্যানস ল্যান্ডে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৭০০ ফুট উপরে অবস্থিত চিকনকালা গ্রাম। গ্রামের লোকজনের ধারণা, অতৃপ্ত অপদেবতার বাস রয়েছে গ্রামটির জঙ্গলে। প্রতি বছর হঠাৎ একদিন কোনো জানান না দিয়েই বনের ভেতর থেকে বিচিত্র ধুপধাপ শব্দ শোনা যায়।
শব্দ শুনলে গ্রামের শিশু-বৃদ্ধ সবাই আতঙ্কে জমে যায়। তারা মনে করে, পিশাচের ঘুম ভেঙেছে। বনের ভেতরে থাকা কাঠুরে বা শিকারির দল ভয় পেয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে বন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রতি বছরই এক দুজন পেছনে রয়ে যায়। তারা আর কোনোদিন গ্রামে ফিরে আসে না। ক’দিন পরে হয়তো জঙ্গলে তাদের মৃতদেহ আবিষ্কার হয়। সারা শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। কিন্তু লাশের চেহারা দেখে মনে হয় সাংঘাতিক ক্লান্ত আর ভয়ঙ্কর কোনো কিছু দেখে আতঙ্কে অস্থির। কী দেখে ভয় পেয়েছে আর কীভাবে কোনো ক্ষতচিহ্ন ছাড়া মারা গেছে, সেই রহস্য এখনো চিকনকালার লোকেরা ভেদ করতে পারেনি।

চলনবিল

চলনবিল image source : collected

ভৌতিক স্থানের বিচারে শোনা যায় চলনবিলের কথা। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত সবচেয়ে বড় বিল চলনবিল; নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা এই তিন জেলাজুড়ে যার বিস্তৃতি। আমাদের এই ভুতুড়ে কাহিনীর মূলবিন্দু আপাতত সিরাজগঞ্জ। আরও ভেঙে বললে তাড়াস উপজেলা। শোনা যায়, চলনবিলের এই এলাকায় অনেক আগে একজন জমিদারের বাস ছিল। এই জমিদার অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।
একদিন রাতে হঠাৎ করে জমিদার মারা গেলে সেই রাতের ভেতরেই সেখানে রাতারাতি তিনটি মন্দির গড়ে ওঠে বলে শোনা যায়, যার একটি আবার পরদিনই নিজ থেকে ভেঙে পড়ে। এই তিনটি মন্দির ও মধ্যবর্তী বিলের এলাকা ভুতুড়ে বলে প্রচলিত। এছাড়াও চলনবিলে জিনের প্রভাব আছে বলেও বিশ্বাস প্রচলিত আছে। বিশেষ করে রাতের বেলা চলনবিল পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকেই জিনের সাক্ষাৎ পেয়েছে বলে শোনা যায়।

সুন্দরবন

সুন্দরবন image source: Dhaka Tribune

ইদানীং সুন্দরবনের জল-ডাঙ্গার কুমির ও বাঘের পাশাপাশি অন্য বিপদের কথাও শোনা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অবস্থিত সুন্দরবন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃত। প্রকৃতিকে কাছ থেকে একনজর দেখতে সেখানে গিয়েছিল একটি দল। এ দলেরই একজন আরেকজনকে গহিন বনে তার একটা ছবি তুলে দিতে বলে। ছবি তুলতে গিয়ে লোকটি চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে যায়। এই ঘটনার দুদিন পর একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লোকটির হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়।
তোলা ছবিটি ডেভেলপ করার পরে যার ছবি তোলা হচ্ছিল তার পেছনে সাদা রঙের আবছা নারীমূর্তি দেখা যায়। যদিও অনেকেই পুরো ঘটনাকে গুজব হিসেবে উড়িয়ে দিচ্ছেন এবং ওই ছবিটিকে ফটোশপের কারসাজি বলে অভিহিত করছেন। উল্লেখ্য যে, আর কোনো সুন্দরবনগামী দলের সঙ্গে এরূপ হয়নি। সুন্দরবন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত আছে যে, মৃত বাঘের আত্মারা নাকি গভীর জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়।

কুয়াকাটা বিচ

কুয়াকাটা বিচ image source: WIKI

‘সাগর কন্যা’ হিসেবে অভিহিত সৌন্দর্যের লীলাভূমি কুয়াকাটা। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র সমুদ্রসৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটিই দেখা যায়। ২০ কিলোমিটার লম্বা ও ৬ কিলোমিটার চওড়া এই সৈকতকে ঘিরে নানান ভুতুড়ে কাহিনী প্রচলিত আছে।
মুইসুলিপাড়ার বাসিন্দা পিতা ও পুত্র মাছ ধরতে ও জ্বালানি কাঠের ব্যবস্থা করতে গঙ্গামাটির গহিন জঙ্গলে গিয়েছিল। সাগরে যেহেতু সুপেয় পানি নেই, তাই তৃষ্ণা নিবারণার্থে তারা মাটি খুঁড়তে শুরু করে সুপেয় পানির আশায়। একসময় তাদের কোদাল শক্ত কিছুতে আঘাত করে। তারা সোনালি আবরণের একটি কাঠের জার এবং কিছু কারুকাজ করা সোনার পাত খুঁজে পান। আরও খোঁড়াখুঁড়ি করার পর তারা বালিতে গেঁথে থাকা সোনা ও ধনরত্ন বোঝাই পুরনো একটি নৌকার হদিস পান। সূর্যাস্তের সময় প্রায় হয়ে যাওয়ায় সেদিনকার মতো কাজে ক্ষান্ত দিয়ে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তারা।
পরদিন ভোর সকালে এসে আবার কাজ করবেন ভেবে সেদিনের মতো তারা সেখান থেকে চলে যান। কিন্তু তাদের জীবনে আর কোনো নতুন সকাল আসেনি। ফেরার পথে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় পিতা-পুত্রের। জনশ্রুতি আছে, সোনাবোঝাই নৌকোটি অভিশপ্ত, যে-ই তার অনুসন্ধান করবে অপঘাতে মারা পড়বে সে। আরও কিছু ঘটে যাওয়া ঘটনা স্থানীয়দের এই বিশ্বাসকে মজবুত করেছে। এমনও বলা হয় সেই পিতা-পুত্রের আত্মা হিংসাবশত সেখানেই রয়ে গেছে নৌকাটি পাহারা দেওয়ার জন্য। তাই ওইদিকে এমনকি ওইদিকের কোনো রাস্তা দিয়ে কেউ গেলেও তাদের ছায়ামূর্তি বিভিন্নভাবে ভয় দেখাবার চেষ্টা করে। এছাড়াও অন্য একটি ঘটনার কথা শোনা যায়। ঘটনাটা একটি মন্দিরকে ঘিরে।

বগা লেক

বগা লেক image:  সুমাইয়া জাহান

বগা লেক আরেক বিস্ময়ের নাম। বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে রুমা উপজেলার কেওক্রাডং পর্বতের কাছে অবস্থিত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার স্বাদু পানির হ্রদ। বম ভাষায় বগা মানে ড্রাগন। বমদের রূপকথা অনুযায়ী অনেক আগে এই পাহাড়ে এক ড্রাগন বাস করত। ছোট ছোট বাচ্চাদের ধরে খেয়ে ফেলত। গ্রামের লোকেরা ড্রাগনকে হত্যা করলে তার মুখ থেকে আগুন আর প্রচ- শব্দ হয়ে পাহাড় বিস্ফোরিত হয়।
রূপকথার ধরন শুনে মনে হয়, এটা একটা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুতপাত। উপজেলা পরিষদের লাগানো সাইনবোর্ডে সরকারিভাবে এই রহস্যের কথা লেখা। এখনো এর গভীরতা কেউ বলতে পারে না। প্রতি বছর রহস্যময়ভাবে বগা লেকের পানির রঙ কয়েকবার পালটে যায়। যদিও কোনো ঝর্না নেই তবুও লেকের পানি চেঞ্জ হলে আশপাশের লেকের পানিও চেঞ্জ হয়। হয়তো থাকতে পারে আন্ডারগ্রাউন্ড রিভার।
রহস্য ভেদ হয়নি এখনো।

Video

Follow Me

Calendar

May 2021
M T W T F S S
« Jan    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31