শিল্পী: যামিনী রায়
অষ্ট-ব্যঞ্জণ

পটচিত্র : ছবি কথন

নাবিহা নাহিন

গ্রাম বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের অন্যতম আকর্ষণ পটচিত্র। পটচিত্রের শুরু কবে তার সঠিক সময়কাল জানা সম্ভব হয়নি। অনুমান করা হয়, পটচিত্রের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো

গ্রাম বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের অন্যতম আকর্ষণ পটচিত্র। পটচিত্রের শুরু কবে তার সঠিক সময়কাল জানা সম্ভব হয়নি। অনুমান করা হয়, পটচিত্রের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। ‘পট’ এর আভিধানিক অর্থ-বস্ত্র, যা সংস্কৃত পট্ট শব্দ থেকে এসেছে। লম্বা কাপড়ে দীর্ঘ রেখা টেনে ছবি আঁকাই হচ্ছে পটচিত্র।

পটচিত্র আঁকার কাজে ব্যবহৃত হত দেশজ রঙ এবং মোটা কাপড়। তবে কাপড়ে পটচিত্র আঁকার প্রচলন কমে যায় কাগজ আবিষ্কারের পর থেকেই। পট চিত্রশিল্পীদের ডাকা হয় পটুয়া নামে। তারা যে শুধু চিত্রশিল্পীই তা নয়, তারা চিত্র প্রদর্শনীর সময় সুরে সুরে গানে গানে কাহিনী বিবরণ করে থাকেন। পটচিত্রের সময় যে গান গাওয়া হয় তা পটের গান নামে পরিচিত।

বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় পটচিত্র ছিল গাজীর পট। এখানে গাজীর বিভিন্ন বিজয় গাঁথার কথা বর্ণনা হতো বিভিন্ন ঢঙে। গাজীর পট মূলত ছিল ইসলামভিত্তিক পটচিত্র

গাজীর পটচিত্র

পটুয়ারা সাধারণত মাপকাঠি কিংবা মডেল সামনে বসিয়ে নিয়ম-রীতি মেনে ছবি আঁকেন না। দীর্ঘ রেখা টেনে কাহিনী চিত্রায়িত করেন নিজেদের মতো করে। তাই শিল্পসমঝোতাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি এই পটচিত্র। তবে এটা তাদের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য কিংবা পটচিত্রের নিজস্ব স্বকীয়তা। তারা মুখের রেখা টানার সময় সেখানে কোনো অনুভূতি প্রকাশের প্রয়োজন মনে করেন না, বিভিন্ন রকমের অবয়ব এঁকে গল্প সাজান ধারাবাহিকভাবে। পটচিত্রগুলো সুনিপুণও হয়না, কারন পটচিত্রগুলো সাধারণত কয়েক ধাপে আঁকা হয়। প্রথমে চিত্রকর অবয়ব আঁকেন তারপর মহিলারা রঙ ঢালাই করেন। এভাবে একসাথে প্রায় দেড়শো-দুইশো পট এঁকে ফেলে তারা। যে কারনে খুব সূক্ষ্মতম ছবি আঁকার ক্ষেত্রে পটুয়ারা অনভ্যস্ত। তারা তাদের ছবিতে বিভিন্ন গল্প সাজান।

পটচিত্র অঙ্কনের জন্যে লোকজ কাহিনী, পৌরাণিক কাহিনী, কিংবা দীর্ঘ কোনো গল্পের প্রয়োজন পরে তাদের। নিম্নমানের এই চিত্রশিল্পীদের প্রচন্ড ধৈর্যশক্তি, তারা বিভিন্ন অঞ্চলে, হাতে প্যাঁচানো পটচিত্র একটা একটা করে খুলে কাহিনী বিবরণ করেন সুরে সুরে। সবচেয়ে প্রচলিত দুইটি পটচিত্র হচ্ছে- কালিঘাট পটচিত্র ও গাজীর পটচিত্র। প্রথম দিকে পটচিত্র ছিল ধর্মীয় জ্ঞানসমৃদ্ধ। পটুয়ারা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে পটচিত্র দেখিয়ে গল্প বর্ণনা করার সাথে সাথে নীতিকথাও ছড়িয়ে দিতেন।

ধীরে ধীরে পটচিত্রের প্লাটফর্মে পরিবর্তন আসে। বিভিন্ন অপসংস্কৃতি মিশে যায় পটুয়াদের মাঝে, যার কারনে নারীচিত্র উপস্থাপন হতো অশ্লীল ভঙ্গীতে। কালিরঘাটের পটচিত্রে এর কিছু প্রমাণ মিলে জায়গায় জায়গায়। তবে আনন্দের খোরাক জোগাতে বিভিন্ন রাজা-রাণীর কাহিনী, দস্যু কাহিনী, লৌকিক গাঁথা পটুয়ারা দেখিয়ে বেড়াতেন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে। মূলত এটা ছিল মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম।

পটচিত্রে শুধু ছবিই প্রদর্শিত হতো না, সুরে সুরে গানের মাধ্যমে বলা হত কেচ্ছা-কাহিনী। বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় পটচিত্র ছিল গাজীর পট। এখানে গাজীর বিভিন্ন বিজয় গাঁথার কথা বর্ণনা হতো বিভিন্ন ঢঙে। গাজীর পট মূলত ছিল ইসলামভিত্তিক পটচিত্র, তবে কোনো কোনো জায়গায় গাজীকে বাঘের উপর আসীনও দেখা গিয়েছে। ধীরে ধীরে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এবং উচ্চমানের শিল্পকলায় পটচিত্র পিছনে পরে যায়।

পটগান গাচ্ছেন জনৈক শিল্পী
সংগৃহীত

বিনোদনের বিভিন্ন আকর্ষনীয় মাধ্যমের কারনে মানুষ ভুলে যেতে থাকে পটচিত্রের কথা। বাংলার লোকসংস্কৃতির অন্যতম এই পটচিত্র বর্তমানে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছে। এখনো কিছু এলাকায় পটুয়াদের বংশধররা পারিবারিক ঐতিহ্য চর্চায় এঁকে চলেছেন পটচিত্র। তবে হাজার বছরের দেশীয় ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায় সেদিকে নজর দিতে হবে আমাদের শিল্পীসমাজকেই। বেঁচে থাকুক পটশিল্প- গল্প এবং গানে।

Video

Follow Me

Calendar

October 2020
M T W T F S S
« Jun    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031