ব্যাক্তিত্ব

ধীর আলী মিয়া: বাংলা গানের নিরব সারথি

বাঁশি বাজনারত ধীর আলী মিয়া

মিসবাউল হাসান তাঈফ

মধ্যযুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত গুণীদের কদর করার ইতিহাস মোটেও সমৃদ্ধ নয়। তাই নিরবে নিভৃত্বে হারিয়ে যান আমাদের গুণীজন। এসব হারিয়ে যাওয়াদের ভীরে ‘ধীর আলী মিয়া’ এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

কথায় আছে, ‘যে দেশ গুণীজনকে কদর করতে জানে না সে দেশে গুণীজন জন্মায় না’। শুনতে খারাপ লাগলেও উক্ত প্রবাদের বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের মাঝে কম-বেশী বিদ্যমান। মধ্যযুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত গুণীদের কদর করার ইতিহাস মোটেও সমৃদ্ধ নয়। তাই নিরবে নিভৃত্বে হারিয়ে যান আমাদের গুণীজন, আমাদের অনুপ্রেরণা কিংবা আমাদের আদর্শ। এসব হারিয়ে যাওয়াদের ভীরে ‘ধীর আলী মিয়া’ এক অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র।

সঙ্গীতঙ্গ ধীর আলী মিয়া

‘পলাশ ঢাকা কোকিল ঢাকা আমার এ দেশ ভাই রে’- দেশাত্ববোধক এ গানটি শুনেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অমর এ দেশাত্ববোধক গানটির সুর দিয়েছেন সঙ্গীতজ্ঞ ধীর আলী মিয়া। যিনি একজন প্রখ্যাত বংশীবাদকও! সারাটা জীবন যিনি ব্যয় করেছেন সংগীত সাধনার পিছনে। শুধু যে সংগীত সাধনা করে গেছেন তাই নয়, ছিলেন একজন সংগঠকের ভূমিকায়ও। আরও ছিলেন সংগীত এবং অর্কেস্ট্রা পরিচালক।

ধীর আলী মিয়া

মুন্সিগঞ্জ জেলার বাঁশবাড়ি গ্রামের সংগীত পরিবারেরই সন্তান ধীর আলী মিয়া। পারিবারিক সূত্রে সংগীতে হাতেখড়ি। ধীরে ধীরে বাঁশি হয়ে ওঠে তার প্রিয় বাদ্যযন্ত্র। যখন তখন বাঁশি নিয়ে বসে পড়তেন। ১৯২০ সালে জন্ম নেয়া ধীর আলী যেন বাঁশি হাতে নিয়েই জন্মেছিলেন। বাংলাদেশের তিনি একজনই বংশীবাদক- যার বাঁশির সুরে ছিল মাটির গন্ধ, সবুজের শান্তি। অবশ্য ধীর আলীর বাঁশি যে শোনেনি তার পক্ষে এ কথা অনুধাবন করা কষ্টকরই বটে। সে সময় ধীর আলী মিয়ার বাঁশির সুরে মানুষ সম্মোহিত হয়ে যেত।

ধীর আলীর স্কুলের গণ্ডি ছিল হাইস্কুলের আঙিনা পর্যন্ত। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে কিছুদিন সোনারং উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এরপরই তিনি সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগবশত পড়ালেখায় ইস্তফা দিয়ে প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ পিতৃব্য সাদেক আলীর নিকট বংশীবাদনে পাঠগ্রহণ শুরু করেন। ধীর আলী বাঁশি ছাড়া বেহালা, গিটার এবং ক্লারিওনেট বাদনেও বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তবে বংশীবাদক হিসেবেই তার খ্যাতি সর্বাধিক ছড়িয়ে পড়ে। আধুনিক বাংলা গানে লোকসঙ্গীতের সুর সংযোজন করে তিনি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন।

ধীর আলী ১৯৪৫ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঢাকা কেন্দ্রে অনিয়মিত বংশীবাদক হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে এই কেন্দ্রেই তিনি নিজস্ব শিল্পী হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৮৩ সালে উপপ্রধান সঙ্গীত প্রযোজক হিসেবে চাকরি থেকে অবসর নেন। তিনি বুলবুল ললিতকলা একাডেমী ও আর্টস কাউন্সিলের প্রশিক্ষণ কোর্সে শিক্ষকতার দায়িত্বও পালন করেন।

ঢাকা অর্কেস্ট্রা

ভারতবর্ষে বিংশ শতকের পূর্বভাগে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের সঙ্গে বিদেশ সফর শেষে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর দেশিয় বাদ্যযন্ত্র সমন্বয়ে প্রথম বৃন্দবাদন(যন্ত্রসংগীতের দল/অর্কেস্ট্রা) প্রচলন করেন। মাইহার-রাজের সভাসঙ্গীতজ্ঞ পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালে তিনি ‘মাইহার স্ট্রিং ব্যান্ড’ নামে একটি অর্কেস্ট্রা দল গঠন করেন। তাকে অনুসরণ করে তার অনুজ ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ রামপুর রাজ্যের সভাসঙ্গীতজ্ঞ পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালে ‘রামপুর স্ট্রিং ব্যান্ড’ প্রবর্তন করেন। এরপর তিমিরবরণ, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ আলী আকবর খান, ওস্তাদ ফুলঝুরি খান, ওস্তাদ আবেদ হোসেন খান, ওস্তাদ মীর কাশেম খান, সমর দাস, দেবু ভট্টাচার্য, ওস্তাদ খাদেম হোসেন খান, ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খান, সাদের আলী, প্রমুখ শিল্পী নানাসময়ে অর্কেস্ট্রা পরিচালনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

বাঁশি বাজনারত ধীর আলী মিয়া

কবি আবদুল হাই মাশরেকী মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লিখেছিলেন ‘বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা জারি’। ধীর আলী মিয়ার সুরে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বেতারে আবদুল আলীম ও সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে এ জারি গানটি রেকর্ড করা হয়

এ হলো অর্কেস্ট্রার মোটামুটি ইতিহাস। কিন্তু এখানে (ইতিহাসে) যার নাম নেই সে হলো ধীর আলী মিয়া। অথচ বাংলার অর্কেস্ট্রার নাম নিলে যদি ধীর আলীর কথা বাদ যায় তাহলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ ৭০-৮০ দশকে ‘ঢাকা অর্কেস্ট্রা’ নামে একটি অর্কেস্ট্রা দল গঠন করে সে সময়ে সাড়া জাগিয়েছিলেন তিনি। যা ঢাকা তথা বাংলাদেশের প্রথম অর্কেস্ট্রা দল।

সুরের কারিগর

‘হিজ মাস্টার্স ভয়েজ’ এবং ‘ঢাকা গ্রামোফোন কোম্পানি’ থেকে ধীর আলীর সুরে ও পরিচালনায় অনেক গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। ঢাকা থেকে নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি ‘মুখ ও মুখোশ’-এ তিনি সহকারী সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে তিনি নাচঘর, উজালা, জোয়ার এলো, কাঞ্চনমালা, আবার বনবাসে রূপবান, দস্যুরানী, কাজলরেখা প্রভৃতি ছায়াছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তিনিই বাংলার লোকজ ও পল্লিসুরের ঐতিহ্যে আধুনিক বাংলাগানের এক অভূতপূর্ব শ্রোতাপ্রিয় অভিনব রূপের স্রষ্টা। তার কিছু কালোত্তীর্ণ গান: ‘ফুল ছিঁড়ো না নিয়ো সুরভি’, ‘কলশি কাঁখে ঘাটে যায় কোন্ রূপসী’, ‘বাসন্তী রঙ শাড়ি পরে কোন্ বঁধুয়া চলে যায়’, ‘খোকনমণি রাগ করে না’, ‘আমি বন্ধু প্রেমে হইলাম পাগল’, ‘ঢাকা শহর দেখতে এসে ঘুরছি গোলকধাঁধায়’।

একুশে পদক সম্মান পত্র

আরও এক বিশেষ ক্ষেত্রে ধীর আলী অবিষ্মরণীয়। তা হলো মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি কেন্দ্রিক রচিত ‘জারি’ গানে ধীর আলীর সুর! কবি আবদুল হাই মাশরেকী মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লিখেছিলেন ‘বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা জারি’। ধীর আলী মিয়ার সুরে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বেতারে আবদুল আলীম ও সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে এ জারি গানটি রেকর্ড করা হয়।

সঙ্গীত পরিচালনার জন্য পাকিস্তান সরকার ১৯৬৫ সালে ‘তমঘায়ে ইমতিয়াজ’ এবং যন্ত্র ও লোকসঙ্গীতে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৬ সালে ‘একুশে পদক’ (মরণোত্তর) প্রদান করে। ‘একুশে পদক’ পান মৃত্যুর দু’বছর পর, অর্থাৎ ধীর আলী পরপারে পাড়ি জমান ১৯৮৪ সালে। গুণীর কদর মৃত্যুর পর এভাবেই কি জ্বল জ্বল করে?

অথচ আজকের প্রজন্ম ধীর আলীর নামই শুনেনি! না শুনলেও বলতে বাধ্য, শ্রদ্ধেয় ধীর আলী মিয়া বেঁচে থাকবেন সংগীতপ্রেমী সকল প্রজন্মের মাঝেই। জয়তু: ধীর আলী মিয়া, জয়তু: গুণীজন।

তথ্যসহায়ক
সংগীতভাবনা, ফজল-এ-খোদা (২০১২)
বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া

Video

Follow Me

Calendar

May 2021
M T W T F S S
« Jan    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31