image source: axios
পর্যবেক্ষণ

দালির বিস্ময়কর পরাবাস্তব ছবি: পর্ব ১

লুফাইয়্যা শাম্মী

১৯০৪ সালে স্পেনের ক্যাটালোনিয়ার ফিগুয়েরেস শহরে জন্মগ্রহণ করেন বিস্ময়কর দালি। ছোট থেকেই অদ্ভুত গড়নার এই মানুষ চিত্রশিল্পের জগতে প্রবেশ করলে সৃষ্টি হয় অদ্ভুত এক বিপ্লবের

চিত্রশিল্পী সালভাদর দালি স্যুরিয়ালিস্টিক এবং এবস্ট্রাক্ট পেইন্টিংয়ের জন্য বিখ্যাত চিত্রশিল্পের জগতে। কিউবিজম, ফিউচারিজম ও মেটাফিজিক্যাল পেইন্টিংয়ের মাধ্যমে তিনি তার চিত্রশিল্পে স্বপ্ন, কল্পনা, নির্মোহ বাস্তবতা ও মানুষের মনোজগতকে এমনভাবে রূপ দিয়েছেন যার কারনে দালি আজও জগদ্বিখ্যাত। পাশ্চাত্য চিত্রকলায় শিল্প আন্দোলনের ইতিহাস সাজিয়ে তুলেন তিনি নিজের স্যুরিয়ালিস্টিক চিত্রকলার মাধ্যমে।

১৯০৪ সালে স্পেনের ক্যাটালোনিয়ার ফিগুয়েরেস শহরে জন্মগ্রহণ করেন বিস্ময়কর দালি। ছোট থেকেই অদ্ভুত গড়নার এই মানুষ চিত্রশিল্পের জগতে প্রবেশ করলে সৃষ্টি হয় অদ্ভুত এক বিপ্লবের। অসচেতনতার কল্পনা কিংবা আবেগকে একটি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার প্রবণতা থেকে দালি পৃথিবীকে দেন শ্রেষ্ঠ কিছু চিত্রশিল্প, চিত্রকলায় যুক্ত করেন নতুন এক অধ্যায়। দালির চিত্রকলা এতো বেশি বিখ্যাত যে শুধু তার জন্যই দুইটি মিউজিয়াম তৈরি করা হয়েছে। তিনি শুধু প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী ছিলেন তা নয়। তার নিজের প্রতি এতোটাই আত্মবিশ্বাস ছিল যে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে নিজেকে নিয়ে লিখেন- ‘দ্য সিক্রেট লাইফ অব সালভাদর দালি’। দালিকে বুঝতে হলে, জানতে হলে তার চিত্রকর্মের দিকে নজর দেয়া আবশ্যক।

দ্য পারসিসটেন্স অব মেমোরি

দ্য পারসিসটেন্স অব মেমোরি; ১৯৩১ source: WIKIART

সালভাদর দালির বিখ্যাত কিছু চিত্রকলার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ‘দ্য পারসিসটেন্স অব মেমোরি।’ বহুল আলোচিত এই ছবির অন্যতম আকর্ষণ ঘড়ি। পটভূমিতে দেখা যায়, সমুদ্রের তীর ঘেষে পাহাড় স্থির অনড় দাঁড়িয়ে। একটা টেবিলে গাছের কান্ডে ঝুলন্ত ঘড়ি। কিছু আকৃতি, কিছু ছোট অবজেক্ট। তবে বেশি চোখে পড়ে চারটি পকেট ঘড়ি- যা বিচিত্র ভাবে পরে আছে চার জায়গায়। তিনটি ঘড়ি যেন গলে গলে পড়ছে। বাকী একটি ঘড়ি অন্য তিনটি ঘড়ি থেকে ভিন্ন। কমলা রঙের ঘড়ি এবং তার কেন্দ্রের দিকে মুখ করা অনেক গুলো পিঁপড়ে, যেন কোনো কিছুর আকর্ষণে ছুটে চলছে কেন্দ্র অভিমুখে। দালীর সমস্ত কাজই মনের সচেতন এবং অবচেতন ভাবকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা। গলে যাওয়া ঘড়ি গলে পড়া সময় হতে পারে, হতে পারে অসতর্ক মনের প্রতিবিম্ব। অবচেতন মনের নিরবচ্ছিন্ন ভাবনা, যা হারিয়ে যাওয়ার দিকে এগুচ্ছে ক্রমাগত। আর কমলা রঙের ঘড়ি তার সচেতন মনের অবস্থা, যা গলে যাচ্ছে না কিন্তু পিঁপড়ের দল জেঁকে ধরেছে। যা সচেতন মনের ধ্বংস কিংবা ক্ষতির সম্মুখীন এক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থাও হতে পারে, হতে পারে নিজেই কিভাবে সময়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছি কিংবা সময় কিভাবে ধীরে নষ্ট হচ্ছে চোখের সম্মুখে। সমুদ্রের জায়গায় সমুদ্র, পাহাড়ের জায়গায় পাহাড় দাঁড়িয়ে শুধু সময় গলে গলে পড়ছে অবচেতনভাবে।হতে পারে ‘দ্য পারসিসটেন্স অব মেমোরি’ শুধুই সচেতন ও অবচেতন মনের একটা অবস্থা বুঝাতে চেয়েছেন সালভাদর দালি।

দ্য ফেইস অভ ওয়ার

দ্য ফেইস অভ ওয়ার; ১৯৪০ source: WIKIART

দালির অন্য একটি বিখ্যাত চিত্র হচ্ছে ‘দ্য ফেইস অভ ওয়ার’। নিজ মাতৃভূমি থেকে ক্যালিফোর্নিয়াতে নির্বাসিত দালি যুদ্ধের ভয়াবহতার এক অনন্য চিত্র ফুটিয়ে তুলেন তার ‘দ্য ফেইস অব ওয়ার’-এ। এই ছবিটির সময় স্পেনের গৃহযুদ্ধের শেষ এবং ২য় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কাল।এই ছবির কেন্দ্রে এক ভীত আতঙ্কিত নারীমুখ কিংবা বলা হোক যুদ্ধের মুখ। যার চোখের ভেতর কঙ্কাল, তার ভেতরেও কঙ্কাল, এভাবেই কঙ্কালের পুনঃপৌনিক একটা অবস্থা যেন, চলছেই। অর্থাৎ এটার এক অর্থ করলে বলা যেতে পারে নারীর চোখ শুধু মৃত্যু দেখেছে, মৃত লাশ বয়ে বেড়ানো চোখে মানুষের কঙ্কাল ব্যতীত আর কিছু নেই।তেমনি নারীটির মুখেও কঙ্কাল, ঠিক চোখের মতো, পুনঃপৌনিকভাবে চলছেই। অর্থাৎ নারীর মুখ ও চোখ শুধু মৃত্যুর কথাই বলছে, অগণিত মৃত্যুতে ভরে আছে চোখ, মুখ। যুদ্ধের এক ভয়াবহ অবস্থা নিজের চোখে দেখে আতঙ্কিত ভীত এক নারীর রূপ। নারীমুখের পিছনে এক ভয়াবহ শূন্যতা, কিছুই নেই, এ হতে পারে যুদ্ধের ধ্বংসের কারনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে সেটা বুঝানো হয়েছে। নারীমুখের এক পাশে একটি হাতের ছাপে হয়তো দালি তার নিজের অবস্থাটাই বুঝাতে চেয়েছেন। জন্মস্থান স্পেনের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের প্রতিফলন দালীর এই চিত্রকর্ম। যাতে তিনি দেখিয়েছেন- মৃত্যু, শূন্যতা, মৃত্য এবং মৃত্যুর সাক্ষ্য এক মৃত্যুর দলিল। 

দ্য গ্রেট মাস্টারবেটর

দ্য গ্রেট মাস্টারবেটর; ১৯২৯ source: WIKIART

দালির অন্যতম আলোচিত এক সৃষ্টি। ধারণা করা হয় এটি দালির শেলফ পোর্টেট। এই ছবিতে যৌনতা, বিতৃষ্ণা কিংবা তারচেয়েও বেশি কিছু বোঝানো হয়েছে। অনেকগুলো অবজেক্ট দেখানো হয়েছে, যা ধরে ধরে আলোচনা করা সম্ভব নয়, কারন শিল্পীর মনের অবস্থা বুঝে এই ছবি আলোচনা করা অন্তত আমার পক্ষে সম্ভব-ই নয়। এই ছবিতে তবুও যা বুঝা যায়- একটি শান্ত মুখ, বন্ধ চোখ-পরিশ্রান্ত! ক্লান্ত হতে পারে। নাকের কাছে ঘাসফড়িং।দালি ছোট বেলায় ঘাসফড়িং প্রচণ্ড ভয় পেতেন। হয়তো এই ছবিতে তিনি ঘাসফড়িং দিয়ে তার ভয়টা ফুটিয়ে তুলেছেন। আবার পেটে কিছু পিঁপড়ে দেখিয়েছেন। এর মাধ্যমেও ভয়, ধ্বংস, কিংবা আতঙ্কের কিছু বুঝিয়েছেন হয়তো। হাঁটু ফেঁটে রক্ত বের হওয়া দুটো পা ঠিক কি বুঝানো হয়েছে বলা কষ্টকর, হতে পারে রক্তক্ষরণ, কষ্ট, যন্ত্রণা বুঝাতে চেয়েছেন। একটি নারীমুখ যা পুরুষাঙ্গের কাছে থেমে আছে, সঙ্গমের আনন্দ, উত্তেজনা-ফ্যান্টাসি বুঝাতে এটা এঁকে থাকতে পারেন। এই ছবিতে পাথর, গাছের ডাল, মানুষের অবয়ব, সিংহের মুখ এবং আরো কিছু অবজেক্ট রয়েছে যা ছবিকে করে তুলেছে দুর্বোধ্য। এই ছবিতে দালি সঙ্গমের প্রতি ভয়, বিতৃষ্ণা আবার ফ্যান্টাসি সবকিছু একই সাথে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন, যার কারনেই তা হয়ে উঠেছে অধিক আলোচিত।

Video

Follow Me

Calendar

October 2020
M T W T F S S
« Jun    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031