আর্টস ব্যাক্তিত্ব

তারেক মাসুদ ও তার মায়ের গল্প

তারেক মাসুদ: দিদারুল লিমনের আঁকা পোট্রেট

মোঃ মোস্তাক খান

পৃথিবীর প্রায় সকল মা-সন্তানের গল্প একই। তবুও এর ভেতর কিছু কিছু গল্প অন্যান্য অনেক বাস্তবতাকে হার মানায়। তেমনি এক গল্প ‘তারেক মাসুদ ও তার মা’

নুরুন্নাহার মাসুদ, একজন রত্নগর্ভা জননী। বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তাকের মাসুদের মা। মায়ের চোখে প্রতিটি সন্তানই এক একটি হীরের খণ্ড। তারপরও সন্তানদের মধ্যে কেউ পিতা-মাতাকে নিজের কর্ম গুণে আরো মহিমান্বিত করেন। একজন তারেক মাসুদের জন্ম দিয়েছিলেন বলেই পরোক্ষ ভাবে তার পরিচয় হয়ে উঠেছে তারেক মাসুদের মা।

নুরুন্নাহার মাসুদ পার্শ্ববর্তী নগরকান্দা থানার ফুলসুতি গ্রামের বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আমিরুদ্দিন চৌধুরী এবং মা আমিরোন্নেছা। তার জন্মসাল ঠিক জানা না গেলেও অনুমান করা হয় ত্রিশ এর দশকের দিকে। দেশ বিভাগের সময় নাকি (তার ভাষ্যমতে) বয়স এগারো ছিল অর্থাৎ তখন ১৯৩৬ সাল। সে সময় নারীশিক্ষা ব্যবস্থা তেমন প্রশস্ত ছিল না বলে বাড়িতেই শিক্ষক রেখে এবং স্থানীয় বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৫১ সালে ভাঙ্গা থানার আরেক ঐতিহ্যবাহী মিয়া পরিবারের মশিউর রহমান মাসুদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন তিনি। তখন মশিউর রহমান মাসুদের বয়স ছিল তার বয়সের দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। মশিউর রহমান মাসুদ এবং নুরুন্নাহার মাসুদের দ্বিতীয় সন্তান তারেক মাসুদ।

বিবাহের পরে কিশোরী বধূ নুরুন্নাহারের বাড়ির সময়সীদের সাথে হেসে খেলেই পার হচ্ছিলো সময়। কিন্তু হঠাৎ করে স্বামী মশিউর রহমান মাসুদের মধ্যে ধর্মীর পরিবর্তন আসায় তার উপরেও ধর্মীয় কড়া বিধি-নিষেধ নেমে আসে।

তারেক মাসুদের পারিবারিক ছবি
বাঁ থেকে- আলফ্রেডা শেপিয়ার (শ্বাশুড়ি), স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ, তারেক মাসুদ, বাবা মশিউর রহমান মাসুদ, বাবার কোলে তারেক মাসুদের পুত্র নিশাদ বিংহাম পুত্রা মাসুদ, মা নুরুন্নাহার মাসুদ, মায়ের কোলে তারেক মাসুদের ছোট ভাই সাঈদ মাসুদের ছোট মেয়ে সেবন্তি মাসুদ।

মশিউর রহমান মাসুদ তখন বিভিন্ন স্থানে তাবলীগে বেড়াতে লাগলেন আর ছেলেদেরকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিলেন। তারেক মাসুদের বাবার সিদ্ধান্ত ছিল তার সন্তানদেরকে ইংরেজি বা বাংলা পড়াবেন না, যদিও তিনি ছিলেন ভাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বনামধন্য ইংরেজি শিক্ষক

মশিউর রহমান মাসুদ তখন বিভিন্ন স্থানে তাবলীগে বেড়াতে লাগলেন আর ছেলেদেরকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিলেন। তারেক মাসুদের বাবার সিদ্ধান্ত ছিল তার সন্তানদেরকে ইংরেজি বা বাংলা পড়াবেন না, যদিও তিনি ছিলেন ভাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বনামধন্য ইংরেজি শিক্ষক। তিনি কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন। খুব অল্প বয়সেই তারেক মাসুদকে মাদ্রাসায় ভর্তি করান। ফলে ছোটবেলায় তারেক মাসুদ তার মায়ের সান্নিধ্য কালেভদ্রে পেয়েছিলেন। তারেক মাসুদ যখন মাদ্রাসায় থাকতেন তখন তার মা প্রতীক্ষায় থাকতেন। অনেকদিন পর যখন ছুটিতে আসতেন আকাশের চাঁদ যেন মায়ের হাতে ধরা দিত। তারেক মাসুদ মাদ্রাসায় পড়ার কারনে প্রাথমিক সাধারণ শিক্ষা একেবারেই পাননি। তবু যখন তারেক মাসুদ ছুটিতে বাড়ি আসতেন তখন তারেক মাসুদের মা শিশু তারেক মাসুদকে বাংলা ‘বর্ণ’ পরিচয় করাতেন। সে কারনে বলা যায় তারেক মাসুদের প্রাথমিক শিক্ষক তার গর্বিত জননী নুরুন্নাহার মাসুদ। তারেক মাসুদও ছিলেন মায়ের ভীষণ অনুগত। তারেক মাসুদের ছিল নানারকম বিধিনিষেধ। বাড়িতে আসলেও অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে তেমন মিশতে দেয়া হতো না, পাছে মাদ্রাসার আদব-কায়দা ভুলে যায় যদি!

যে ছবিটি বাড়ির দেয়ালে সাঁটানো

১৯৭১ সালে যখন দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো তখন তারেক মাসুদের মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়, সেই থেকেই মাদ্রাসায় পড়ার অবসান হলো। মা চাইতেন তার সন্তানরা সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। তারেক মাসুদ সব সময়ই তার মাকে বলতেন তাকে যেন কোন স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু তার মা একথা বাবাকে বলতে সাহস পেতেন না। যুদ্ধ শেষ, মাদ্রাসাও ততদিনে বন্ধ। মায়ের জোর অনুরোধে তারেক মাসুদকে স্কুলের এক শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে দেওয়া হয়। এরপরই নতুন উদ্যমে শিক্ষা জীবনের যাত্রা শুরু করেন তারেক মাসুদ। ১৯৭৩ সালে মেট্রিক পরিক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন। পরবর্তীতে যদিও তারেক মাসুদের বাবা আর কোন কিছুতে তেমন বাঁধা দেননি আবার উৎসাহও দেননি। নিজের আত্মশক্তি আর মায়ের অনুপ্রেরণাই তারেক মাসুদের পাথেয়।

তারপর তারেক মাসুদ ঢাকাতে পড়াশোনা করতে শুরু করেন, এদিক তার মা তাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে থাকতেন। তাই কিছুদিন পর-পরই ঢাকাতে ছুটে যেতেন তার প্রিয় সন্তানকে দেখার জন্য। তারেক মাসুদের প্রথম জীবন মাদ্রাসায় পরের জীবন ঢাকাতে কাটায় মায়ের সাথে যোগাযোগের একটা দূরত্ব হয়ে গিয়েছিল। তারেক মাসুদ তার মায়ের কাছে তেমন কিছু আবদার করতেন না। প্রথমে তার চাচার বাসায় থেকে পড়াশোনা করতেন। একবার একটা কারনে চাচার বাসা ছেড়ে মেসে উঠেন, এতে প্রচণ্ড অর্থ সংকটে পড়েন। মায়ের অনুরোধে তার বাবা তাকে ১৫০ টাকা দেন, তার থেকেও বাড়ির সমস্যা আছে কিনা বিবেচনা করে ৫০ টাকা বাবার কাছেই ফেরত দিয়ে যান।

তারেক মাসুদ পরবর্তী জীবনে বিশ্ব বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার হলেও তার পরিবারের প্রতি ভীষণ খেয়াল রাখতেন। যখন বাড়িতে আসতেন তখন মাকে রান্না করতে দিতেন না, নিজ হাতে রান্না করে খাওয়াতেন।

মাটির ময়না সিনেমা বানানো হয়েছিল তারেক মাসুদের পরিবারিক গল্পের ছায়া অবলম্বনে। তাই সিনেমাটা তার বাড়িতে শ্যুটিং করার কথা ছিল কিন্তু বাড়িতে শ্যুটিং করলে মায়ের কাজের চাপ বেড়ে যাবে বলে শ্যুটিং অন্যত্র করেন

আলোচক ও তার মায়ের বয়ান মতে মাটির ময়না সিনেমা বানানো হয়েছিল তারেক মাসুদের পরিবারিক গল্পের ছায়া অবলম্বনে। তাই সিনেমাটা তার বাড়িতে শ্যুটিং করার কথা ছিল কিন্তু বাড়িতে শ্যুটিং করলে মায়ের কাজের চাপ বেড়ে যাবে বলে শ্যুটিং অন্যত্র করেন।
মাটির ময়না সিনেমাটা তৈরি করার সময় মায়ের কাছে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করার দরকার হয়নি। তবে তারেক মাসুদ তার মায়ের ভূমিকা যা তুলে ধরেন তার একটুও মিথ্যে নেই। একবার তার মা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলে,” তুমি এসব আমাকে জিজ্ঞেস করোনি কেন?” তারেক মাসুদ হেসেছিলন কেবল।

২০১১ সালে যখন তারেক মাসুদ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তার মাত্র পাঁচদিন আগেই তার বাবা মারা যান। সেই শোকে মা বেহুশ ছিলেন। বাবার মৃত্যুতে সবাই এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে কেউ কাউকে স্বান্তনা দিতে পারছিলেন না। তখন তারেক মাসুদ তার মায়ের কাছে কাছে থাকতেন সব সময়। তিনি বলেন, “এখন মায়ের কাছে কেউ থাকা দরকার, মা তো একা থাকতে পারবে না। কেউ যদি মায়ের কাছে না থাকে তাহলে আমি ঢাকা থেকে এসে থাকব। চারদিন ঠিক তাই ছিলেন কিন্তু হঠাৎ জরুরী ফোন আসায় তিনি ঢাকায় চলে যান। তার একদিন পরেই সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যান। শোকের উপর শোক এসে পড়ে।

নিজ ঘরে তোলা ছবি

এখন প্রায় নব্বই ছুঁই ছুঁই বয়সে বেশ সুস্থ্য সবল ভাবেই বেঁচে আছেন নুরুন্নাহার মাসুদ। পরিবারের অন্য সকলে নিয়ে বাস করলেও এক অপূরণীয় শূন্যতা নিয়ে বেঁচে আছেন। তারেক মাসুদ কেবল তার বড় ছেলেই ছিলেন না, ছিলেন পুরো পরিবারের জন্য ছায়া-শীতল বটবৃক্ষ। তারেক মাসুদ ঘুমাচ্ছেন কবি নজরুলের প্রিয় নার্গিস ফুল বুকে নিয়ে আর সিঁথানে রবীন্দ্রনাথের নীলমনি লতা। নুরুন্নাহার মাসুদ সেদিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখেন দেশে হাজার তারেক মাসুদ জন্ম নিবে। তিনি বিশ্বাস করেন তারেক মাসুদ বেঁচে আছেন সকল চলচ্চিত্রপ্রিয়দের মাঝে।

Video

Follow Me

Calendar

October 2020
M T W T F S S
« Jun    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031