ইতিহাস

ঢাকার ভিস্তিওয়ালা : হারিয়ে যাওয়া জলের কারিগর

অচিন্ত্য অর্ক

ইতিহাস থেকে জানা যায়, চৌসার যুদ্ধে শের শাহের আক্রমণে ডুবতে বসা সম্রাট হুমায়ূনকে বাঁচিয়েছিল  নামে এক ভিস্তিওয়ালা। ওয়াদা অনুসারে, পরে ওই ভিস্তিওয়ালাকে সম্রাট একদিনের জন্য ক্ষমতায় বসান। কিন্তু কারা এই ভিস্তিওয়ালা?

শুরুর কথা

ভাষাবিদদের মতে ‘বেহেশত’ শব্দ থেকে ‘ভিস্তি’ শব্দের আগমন। ‘বেহেশত’ মূলত ফার্সি শব্দ, যার বাংলা অর্থ ‘স্বর্গ’। পশ্চিম এশিয়ার সংস্কৃতি অনুযায়ী মনে করা হয়, স্বর্গে রয়েছে প্রচুর নদী, খাল আর বাগান। একটা সময় মানুষের বিশ্বাস ছিল, ভিস্তিওয়ালারা জল নিয়ে আসেন স্বর্গ থেকে। স্বর্গের জল তারা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন বলে স্বর্গের দূতও বলা হত তাদের! 

রাস্তা ধোয়ার কাজে ভিস্তিরা : সংগৃহীত চিত্রকর্ম

তাদের কাঁধে ঝুলানো থাকত ছাগলের চামড়ার একধরণের মশক। এই মশক দিয়েই টাকার বিনিময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা পানি সরবরাহ করত। ‘ভিস্তি আবে ভিস্তি’ হাঁক দিয়ে প্রতি বাড়ি গিয়ে তারা পানি দিয়ে আসত। ভিস্তিদের কেউ কেউ সুক্কা বলেও ডাকতো। 

বাদশাহ হুমায়ুন source: scroll

ইতিহাসে ভিস্তিওয়ালা 

জানা যায়, মুঘল সম্রাট বাবরের ছেলে হুমায়ুন একবার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন এক খরস্রোতা নদীতে। জলের প্রচণ্ড স্রোতে যখন হুমায়ুনের প্রাণ ওষ্ঠাগত, তখন নাজিম নামে এক ভিস্তিওয়ালা তার জীবন বাঁচিয়েছিলেন। হুমায়ুন তাকে কথা দিয়েছিলেন, যদি কখনও তিনি দিল্লির মসনদে বসতে পারেন, ওই ভিস্তিওয়ালা যা উপহার চাইবেন, তাই দেবেন। পরে হুমায়ুন সম্রাট হলেন, আর সেই ভিস্তিওয়ালা তার কাছে চেয়ে বসলেন সম্রাটের সিংহাসন। বাদশাহ হুমায়ুন নিজের মুকুট পরিয়ে দিলেন ভিস্তিওয়ালার মাথায়, তাকে বসালেন নিজের সিংহাসনে। তখন ভিস্তিওয়ালা সম্রাটকে আলিঙ্গন করে ফিরিয়ে দিলেন তার মুকুট আর সিংহাসন। এমনকি আগেকার দিনে যুদ্ধের সময় জল রাখতে ভিস্তিওয়ালার মসক ব্যবহার করা হত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে দুর্গগুলোতে জলের সরবরাহ করা হত মশক থেকে। 

ঢাকায় ভিস্তিওয়ালা

ঢাকায় ভিস্তিওয়ালা বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঢাকার রাস্তায় ভিস্তিদের আনাগোনা চোখে পড়তো। ঊনবিংশ শতাব্দীর ঢাকা শহরে ছিল সুপেয় পানীর বেশ অভাব। ভারতবর্ষের অন্য অঞ্চলের মতোই ঢাকায়ও খাবার পানির জন্য নির্ভর করতে হতো খাল, নদী বা কুয়ার ওপর। জলভর্তি মশক থাকত ঢাকার টমটম গাড়িতে। 
একই পদ্ধতি ছিল কলকাতা শহরেও। নিরাপদ পানির জন্য তাই শহর অধিবাসীদের অনেক দূরে দূরে ঘুরে বেড়াতে হতো। ঢাকার নাগরিকদের নিরাপদ পানির জন্য সাধারণত শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর পানির ওপর নির্ভর করতে হতো। শহরে যেসব কুয়া ছিল তাতেও ছিল সুপেয় পানীর অভাব। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী লোকরা তাই এক বিশেষ পেশাজীবী শ্রেণির লোকদের মাধ্যমে নিজেদের পানি সংগ্রহ করতেন।

ঢাকার একজন ভিস্তি : সংগৃহীত ছবি

১৮৩০ সালে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট হেনরি ওয়াল্টারস এক আদমশুমারিতে ১০টি ভিস্তিপল্লীর উল্লেখ করেছিলেন।

ঢাকার ভিস্তিরা আবাসস্থল ছিলো সাধারণত পুরান ঢাকার সিক্কাটুলি। স্থানীয়রা ভিস্তিদের বলত সাক্কা। কালক্রমে এই সাক্কা সিক্কাতে পরিণত হয়ে সিক্কাটুলি পাড়ায় রূপ নিয়ে হারিয়ে যাওয়া ভিস্তিওয়ালাদের স্মৃতি বহন করে চলেছে।

ইসলাম ধর্মাবলম্বী এসব ভিস্তিরা ছিল সুন্নি মুসলিম। মহররমের মিছিলে রাস্তায় পানি ছিটিয়ে পরিষ্কার রাখার দায়িত্বে তাদের প্রত্যক্ষ করা যেত। ‘দ্য লাস্ট ওয়াটারম্যান’ খ্যাত বিশেষ এ পেশাজীবী শ্রেণিদের মধ্যে নিজস্ব পঞ্চায়েত ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। পঞ্চায়েত প্রধানকে বলা হতো নবাব ভিস্তি। কলকাতায় একজন ভিস্তি ১০ থেকে ২০ টাকার বিনিময়ে এক মশক পানি সরবরাহ করে দিত।

‘দ্য লাস্ট ওয়াটারম্যান’ খ্যাত বিশেষ এ পেশাজীবী শ্রেণিদের মধ্যে নিজস্ব পঞ্চায়েত ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। পঞ্চায়েত প্রধানকে বলা হতো নবাব ভিস্তি

সাহিত্যপাড়ায় ভিস্তিওয়ালা

বাংলা সাহিত্যে বেশকিছু রচনায় ভিস্তিদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুকুমার রায়, শামসুর রাহমান, হুমায়ূন আহমেদের রচনায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতায় ভিস্তিওয়ালাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন-  ‘তখন বেগে ছুটিল ঝাঁকে ঝাঁক, একুশ লাখ ভিস্তি পুকুরে বিলে রহিল শুধু পাঁক, নদীর জলে নাহিকো চলে কিস্তি।’ সুকুমার রায় তার ‘ন্যাড়া বেলতলায় ক’বার যায়?’ ছড়ায় ভিস্তিদের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন এভাবে-
‘লাখোবার যায় যদি সে যাওয়া তার ঠেকায় কিসে?
ভেবে তাই না পাই দিশে নাই কি কিচ্ছু উপায় তার?
এ কথাটা যেমনি বলা রোগা এক ভিস্তিওলা
ঢিপ্ ক’রে বাড়িয়ে গলা প্রণাম করল দুপায় তার।’ শামসুর রাহমান তার শৈশবের স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে ভিস্তিদের চিত্রায়িত করেছেন এভাবে- ‘রোজ মশক ভরে দুবেলা পানি দিয়ে যেত আমাদের বাড়িতে। কালো মোষের পেটের মতো ফোলা ফোলা মশক পিঠে বয়ে আনত ভিস্তি। তারপর মশকের মুখ খুলে পানি ঢেলে দিত মাটি কিংবা পিতলের কলসীর ভেতর। মনে আছে ওর থ্যাবড়া নাক, মাথায় কিস্তি টুপি, মিশমিশে কালো চাপদাড়ি আর কোমরে জড়ানো পানিভেজা গামছার কথা।’ অন্যদিকে ‘বাদশাহ নামদার’ উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ তুলে এনেছেন সম্রাট হুমায়ূনের বিপদে সেই নাজিম ভিস্তিওয়ালার সহযোগিতার গল্প।

ভিস্তিদের হারিয়ে যাওয়া 

খাজা আবদুল গণি source: flickr

ভিস্তিরা এখন বিলুপ্তি হয়ে গেছে। ঢাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ পানির অপ্রতুলতার প্রতি খেয়াল রেখে নবাব খাজা আবদুল গণি ১৮৭৪ সালে চাঁদনীঘাটে ওয়াটার ওয়ার্কস প্রতিষ্ঠার জন্য দুই লাখ টাকা চাঁদা প্রদান করেন।

তার এই বদান্যতায় ১৮৭৮ সালে ঢাকা পৌরসভায় গড়ে উঠে ঘরে ঘরে পানি সরবরাহের আধুনিক সুবিধা। আরো পরে ১৯৬৩ সালে ঢাকা ওয়াসা প্রতিষ্ঠিত হলে নগরবাসীর নিরাপদ পানির চিন্তা দূরীভূত হয়। আর এরই সঙ্গে কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায় ভিস্তিদের বর্ণাঢ্য পেশাদারি জীবনের। ধীরে ধীরে আবেদন কমতে থাকে একেকজন সুক্কা, সাক্কা বা ভিস্তির। তারাও বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় নিজেদের জড়িয়ে নেয়।



Video

Follow Me

Calendar

October 2020
M T W T F S S
« Jun    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031