ইতিহাস

ঢাকার বাইজি : স্মৃতি বিস্মৃতির ইতিহাস

শান্ত জাবালি

ধ্রুপদী-নৃত্য-গীতে পারদর্শী সম্ভ্রান্ত রমনীদে বলা হতো ‘বাই’। আর অতীতে ভারতের রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাট রাজ্য ‘বাই’ বলতে বোঝানো হতো ধ্রুপদী নৃত্যে ও গীতে পারদর্শী সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীদের। যে সকল নারী নৃত্য শিক্ষা শেষে, শাস্ত্রীয় নৃত্যকে পেশা হিসেবে বেছে নিতো, তাদের নামের সাথে সম্মানসূচক ‘জি’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হতো। তখনকার সময়ে ‘জি’ শব্দটি বর্তমান কালের উচ্চতর পদবির মতোই শোভা পেত নামের সাথে। বাইজিরা সম্রাট, সুলতান, বাদশা, রাজা, নবাব, ধর্নাঢ্য ব্যাক্তি জমিদার রঙমহলে শাস্ত্রীয় নৃত্য পরিবেশন করতেন অর্থের বিনিময়ে। এর পাশাপাশি তারা ব্যক্তিগত সুখ্যাতিও লাভ করতো।

নৃত্যরত বাইজি

আধিপত্যশীল জমিদার-নবাবরা তাদের বাগানবাড়িতে সংগীত-নৃত্য বিশেষে পারদর্শী খ্যাতিনামা বাইজিদের রাখতেন। তাদের আমন্ত্রণ জানানো হতো, এক রাতের জন্য নিজেদের সজ্জিত বিশেষ জলসা ঘরে। রাজকীয় অনুষ্ঠান; যেখানে থাকতো অন্যান্য শৌখিন, অভিজাতশ্রেণী ও উচ্চবিত্তের লোকদের উপস্থিতি-সেইসকল অনুষ্ঠানে থাকতো, বাইজিদের নৃত্য-গান-বাজনা ও খানাপিনা। তারা যাওয়ার বেলায় নিয়ে যেত প্রচুর অর্থ। ‘মাসিরুল উমরা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, ইসলাম খান সরকারিভাবে ১২০০ বাইজির জন্য তৎকালীন ৮০ হাজার টাকা খরচ করেন। সম্ভ্রান্ত-সম্পদশালী সমাজ-নেতাদের বাগানবাড়ি, জলসাঘর কিংবা রঙমহলে শাস্ত্রীয় নৃত্য-গীত পরিবেশন করে অনেক পরিমাণে অর্থ ও খ্যাতিলাভ করতেন। অর্থ আয়ের জন্য তারা বাইরে গিয়ে ‘মুজরো’ আসরে গান গাইতেন ও নাচতেন। আবার তাদের নিজেদের ঘরেও ‘মাহফিল’ বসাতেন।


প্রাচীন ভারতের বাইজি-গণিকারা পরিচিত হতেন বিভিন্ন নামে এবং তাদের মধ্যে শ্রেণিবিভাগ ছিল ৬ টি-
১. রাজবেশ্যা (রাজার অনুগৃহিতা গণিকারা)
২. নগরীবেশ্যা (নগরবাসিনী গণিকা)
৩. গুপ্তবেশ্যা (সদ্বংশীয় নারী যে গোপনে অভিসার করে)
৪. দেববেশ্যা (মন্দিরের দেবদাসী)
৫. ঊ্রহ্ম বেশ্যা বা তীর্থতা (যারা তীর্থস্থানে থাকেন)
৬. সাধারণ গণিকা
এসব বাইজিরা শিল্পকলার বিবিধ গুণের মধ্যে অভিনয়-নৃত্য-বাদ্যযন্ত্রে-চিত্রাঙ্কন এবং চিত্রশিল্প অসাধারণ নৈপুণ্য, তারিফ করার ক্ষমতা, গানে সুর দেওয়া, সুচারুরূপে গৃহ সজ্জা, নান্দনিক প্রসাধন-চর্চায়, কেশ বিন্যাসে, রন্ধন শিল্পে, ধাঁধা তৈরি এবং সমাধানে পান্ডিত্য, পদ্যের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, কবিতা ও গল্প তৈরি করা, রত্ন চেনা, তাস-পাশা-জুয়া খেলার পারদর্শিতা, জড়তাহীন ভাবে সাবলিল কথাবার্তা, চোখ-ভুরু-মুখের বিশেষ ভঙ্গিতে কথা না বলেও মনের ভাব প্রকাশের ক্ষমতা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের যোগ্যতা ও নৈপুণ্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একজন গুণী এই পেশায় যোগ দিতে পারতেন। আর এভাবেই তারা নিজকে একটি শিল্পে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিল।
তিন ধরনের সংগীত ধারা ছিল গণিকা-বাইজিদের-
১. চটুল বা হালকা কথার গান
২. ভক্তিগীতি
৩. উচ্চাঙ্গসংগীত ও রাগরাগিনী ভিত্তিক গান

আজকের মতো তখনকার সময়েও পতিতাবৃত্তির প্রধান ও মৌলিক কারণ-অর্থনৈতিক সমস্যা। তখনকার সময়ে পতিতাবৃত্তি জীবিকানির্বাহ-বিনোদনমূলক একটি মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হতো। বর্তমানের মতো এতটা ঘৃণ্য ও নিন্দনীয় ছিল না পতিতাবৃত্তি। বিক্রমাদিত্য-কৌটিল্যের কালে রীতিমতো রাষ্টীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেতো পতিতারা। গণিকা, গণিকালয় ও সেখানকার ক্রিয়াকর্মেও জন্যে বিভিন্ন নিয়মাবলী পরিচ্ছন্নভাবে লিপিবদ্ধ ছিল-সেবাদানকারী ও গ্রহিতা উভয়ের জন্য। কৌটিল্য শাস্ত্র অনুযায়ী, ‘গণিকার রূপ নষ্ট হয়ে গেলে তাকে ধাত্রীর পদে নিযুক্ত করতে হবে’। গণিকা ও দাসী যখন ভোগের অযোগ্য হবে, তখন তারা কাজ করবে রান্না ঘরে। তার মানে কৌটিল্য গণিকাদের পেশা থেকে অবসর নেবার পর তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়েছেন, কেননা তখনকার দিনে রাষ্ট্র ইচ্ছে করলেই নারীকে গণিকায় পরিণত করতে পারত’।

ঢাকার বাইজি


উত্তর ভারত বিশেষ করে লখনৌ বানারস, পাটনা থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাংলায়- বিশেষ করে কলকাতা এবং কিছু পরিমাণে ঢাকায় আগমন ঘটতে থাকে বাইজিদের। আনুমানিক সার্ধশত বছর আগে ঢাকায় নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতা হতে ঢাকায় আসেন। বেশিরভাগ বাইজি রাগসংগীত ও শাস্ত্রীয় নৃত্যে উচ্চ শিক্ষা সমাপ্ত করে রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত শিল্পী তখন। তারাই নাচ, গান, চলচ্চিত্র ও নাট্য সমৃদ্ধ করেছেন। শোনা যায়, অযোধ্যা থেকে বিতাড়িত হয়ে নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ তখন কলকাতায় এসে নির্বাসিত জীবন-যাপন করেছিলেন। তাকে কেন্দ্র করেই সেখানে সংগীত সভা গড়ে ওঠে। আর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেক বাইজির আগমন ঘটে।
ঢাকার বাইজিদের নাচ গান শুরু হয় মোগল আমলে। সপ্তদশ শতাব্দীতে সূচনা হলেও উনিশ শতকে ঢাকার নবাবদের আমলে বাইজিদের নাচ-গান এবং মাহফিলে জোয়ার আসে। তারা আহসান মঞ্জিলের রংমহল, শাহবাগের ইসরাত মঞ্জিল, দিলকুশার বাগানবাড়িতে নৃত্য-গান পরিবেশন করতেন। ঢাকার বাইজিদের অনুষ্ঠান আয়োজনের স্মৃতিময় গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্থানের একটি হলো আহসান মঞ্জিল অন্যটি নিমতলী প্রাসাদ ।

ছোটি বেগম বাইজি/ ছবিসূত্র- প্রথম আলো

সুলতানি আমলে সোনারগাঁ ছিল রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের একটি বৃহৎ প্রশাসনিক ও সামরিক কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যনগর। অনেক গবেষক সোনারগাঁকে বাংলার সুলতানদের দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবেও মনে করেন। তবে সোনারগাঁ গৌড় পান্ডুয়ার মতো সংগীত ও নৃত্যকলার উর্বর ক্ষেত্র ছিল, এমন ধারণা করা অসংগত নয়। চীনা আরও একজন রাজদূত হুহিয়েন লিখেছেন, ‘এরা যখন নিমন্ত্রণ করে তখন অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য নাচের বন্দোবস্ত থাকে।’ তিনি নর্তকীদের পোশাকেরও একটি স্নিগ্ধ বর্ণনা দিয়েছেন, ‘এরা হালকা লাল রঙের ফুল তোলা জামা পরে। শরীরের তলার দিকটায় এরা রঙিন রেশমের কাপড় জড়িয়ে রাখে। গলায় আর কাঁধে এদের পেনড্যান্ট আর হার। কবজিতে নীল আর দামি পাথর থাকে।’

মোগল শাসনামলে সুবেদার ইসলাম খান রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় নিয়ে আছেন। আর নতুন রাজধানী জাহাঙ্গীরনগরে আরও প্রসারিত হয়েছিল সংগীত আর নৃত্য। সেসময় ঢাকার ছিল একটি দক্ষ সংগীত ও নৃত্যশিল্পীর দল। মি. শার্লিমান তাঁর বাংলার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ঢাকায় ইসলাম খানের দরবারে ১২০০ কাঞ্চনী শোভা পেত। যাদের পেশা নাচ-গান। ‘এ ইতিহাস গ্রন্থে থেকে অনুমিত হয়, ইসলাম খানের ঢাকা আসার আগেও এখানে গান-বাজনার ব্যাপক চর্চা ছিল। তা না হলে ১২০০ কাঞ্চনীর এত অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর দরবারে হাজির হওয়া অসম্ভব হতো।

অজ্ঞাতনামা বাইজি/ ছবিসূত্র- প্রথম আলো

কাঞ্চনী ছাড়াও তাঁর দরবারে ছিল লুলি, হোরকানি ও ডোমনি। তারা সবাই ছিলেন নাচনী মেয়ে। তাদের জন্য ইসলাম খানের বার্ষিক খরচ হতো ৮০ হাজার টাকা। ইসলাম খানের সংগীত ও নৃত্যশিল্পীদের সুখ্যাতি মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কানে পৌঁছাতে দেরি হয়নি। তিনি ঢাকা থেকে কিছু সেরা গায়ক ও নর্তকীকে মোগল শাহি দরবারের জন্য চেয়ে পাঠিয়েছিলেন। সম্রাট তাঁর দরবারের সংগীতজ্ঞ প্রেমরঙ্গাকেও ঢাকায় ইসলাম খানের দরবারে পাঠিয়েছিলেন।

দীর্ঘদিন ছিল ঢাকা সুবে বাংলার রাজধানী। রাজধানীর মর্যাদা হারানোর পরও সংগীতের জন্য ঢাকার খ্যাতি ছিল অটুট। ১৮৫৭ সালের পর এই খ্যাতি আরও বৃদ্ধি পায়। ঢাকার লোকেরা অনেক রসিক! বলা হতো লখনৌর সাধারন লোক সুর এবং লয়ের পার্থক্য জানে, অনুরুপ ঢাকার কী মুসলিম, কী হিন্দু সকলেই তাল সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাদের সামনে অসময়োচিত কিছু অবতারণা করা হলে তারা আপত্তি তুলত। এককালে সুবেদারি মহল থেকে নাচ-গানের মজমা ছড়িয়ে পড়ে শহরের অন্যপ্রান্তে। নগরীতে গড়ে উঠেছিল জমজমাট বাইজিপাড়া।

পুরানো ঢাকার পাটুয়াটুলী ও জিন্দাবাহার লেন ছিল বাইজিদের সবচেয়ে বড় আখড়া। সন্ধ্যা হলে এসব আখড়ায় বসত ধ্রম্নপদী নৃত্য-গীতের আসর। বাইজিরা অপরুপ সাজে সেজে সূরের মূর্ছনা তুলে আসরে নাচত। তাদের নাচ-গানের সুমিষ্ট আওয়াজ পুরো এলাকা মুখর হয়ে উঠত। নবাব, জমিদাররসহ অভিজাত ব্যক্তিরা বাইজিদের আখড়ায় এসে তাদের নৃত্যগীত উপভোগ করতেন। যাদের সামর্থ্য ছিল তারা সুদূর লখনৌ থেকে বাইজি আনিয়ে নিজ রংমহলে নাচ-গানের মাহফিল বসাতেন। সেকালে বাইজিদের মাহফিল করা ছিল নবাব জমিদারদের অভিজাত্যের প্রকাশ।
লখনৌর অনেক বাইজি সংগীতজ্ঞ চলে আসেন মুর্শিদাবাদে। তারপরে আসেন ঢাকায়। তাঁদের সহায়তা করতেন নবাব পরিবারের বংশধরেরা, মৌলভীবাজারের মোগল বংশোদ্ভূত জমিদার ও নবাবপুরের ধনী বসাক পরিবার। এ ছাড়া যাঁরা সাহায্য করতেন তাঁরা হলেন ভাওয়ালের রাজপরিবার, কাশিমপুর বনিয়া ও পুবাইলের জমিদার। তখন লখনৌ, বেনারস, পাটনা ও কলকাতার প্রতিষ্ঠিত বাইজিরা ঢাকায় এসে তাঁদের অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন।
সংগীতের পুরোনো কেন্দ্র হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই ঢাকায় ছিলেন কয়েক গুণ গুণী বাইজি। কণ্ঠসংগীতের ওস্তাদ হুসেন মিয়া ঢাকার অনেক বাইজিকে তালিম দিয়েছিলেন। পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে ঢাকার বাইজিদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। বহিরাগত অনেক বাইজি ঢাকায় দীর্ঘদিন থেকে গেছেন। কেউ কেউ থেকেছেন স্থায়ীভাবে। আবার অনেকে প্রায়ই ঘুরেফিরে ঢাকায় আসতেন। জানা যায়, এসব অস্থায়ী বাইজির পাশাপাশি স্থানীয় মেয়েদেরও বাইজির পেশা বেছে নিয়েছেন।

ঢাকায় বাইজিদের প্রসার ঘটান শাহ সুজা। তিনি লখনৌ থেকে বাইজি আনিয়ে মাহফিলের আয়োজন করতেন। মাহফিল করে বিপুল অর্থ আয়ের সুযোগ থাকায় বাইজিরা ঢাকায় স্হায়ী বসতি গড়ে তোলে। পাটুয়াটুলী ও জিন্দাবাহার লেনে তারা বেশ কয়েকটি বাড়ী ক্রয় করে। নিজ বাড়ীর বৈঠকখানায় মাহফিল করার পাশাপাশি বাইজিরা নবাব, জমিদারদের রঙমহলে বা বাগানবাড়িতে গিয়ে মাহফিল করত।

বাইজিদের সম্পর্কে ঢাকাবাসীর মধ্যে ছিল তীব্র কৌতুহল। বহু কথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। যার বেশীটাই কল্পনাপ্রসূত। বাইজিদের বিশেষ ধরনের জীবনযাপন, কঠোর পর্দার মধ্যে বসবাস এবং প্রহরীদের প্রহরায় ঘোড়াগাড়ীতে যাতায়াতের কারণে মানুষের মধ্যে তাদের সম্পর্কে কৌতুহল ছিল পাহাড়সম। পাটুয়াটুলীর বাইজিরা সঙ্গীদের নিয়ে হেঁটে খুব সকালে অদূরে বুড়িগঙ্গা নদীতে গোসলে যেত। তখন বুড়ীগঙ্গা নদীর পানি ছিল খুবই স্বচ্ছ ও সুপেয়। গোসল পর্ব শেষে বাইজিরা যখন ফিরতো তখন লোকজন গলির মুখে দাড়িয়ে থেকে সিক্ত বসনা বাইজিদের দেখে পুলকিত হতো। এছাড়া সাধারন মানুষের পরে বাইজিদের দেখার আর কোন সুযোগ ছিল না।

ঢাকার বাইজিদের সম্পর্কে অনেক তথ্য দিয়েছেন হাকিম হাবিবুর রহমান (১৮৮১-১৯৪৭), গনিউর রাজা, সৈয়দ তৈফুর, মুনতাসীর মামুন, সাঈদ আহমদ, অনুপম হায়াত ও সত্যেন সেন। এছাড়া পাওয়া গেছে পুরোনো পত্রপত্রিকা ও ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকেও কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য। ঢাকায় বাইজিদের পাশাপাশি খেমটাওয়ালিরাও দোর্দণ্ডপ্রতাপে রাজত্ব করেছেন। বাইজি নাচ-গান আর খেমটা নাচ-গানের মধ্যে পার্থক্যটা সত্যেন সেনের লেখায় ভালোভাবে ফুটে উঠেছে।

নওয়াব আবদুল গনি ও নওয়াব আহসানউল্লাহর দরবারের কয়েকজন বাইজির উল্লেখ করেছেন হাকিম হাবিবুর রহমান। তাদের মধ্যে রয়েছেন সুপনজান, সেকালের নামী গায়িকা ও তবলাবাদক, এনাহীজান নওয়াব আবদুল গনির শাহবাগ উৎসবে নেচেছিলেন। হাকিম সাহেব তাঁকে শাহবাগের বার্ষিক উৎসবে দেখেন বলে লিখেছেন। তিনি উত্তর ভারত থেকে ঢাকায় এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। আবেদী বাই এসেছিলেন পাটনা থেকে। তাঁর এক মেয়ে ১৯৪৬-৪৭ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। আন্নু, গান্নু ও নওয়াবীন এই তিন বোন নওয়াব আবদুল গনির দরবারে নিয়মিত নাচতেন, গাইতেন এবং মাসোহারা নিতেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি ছিল নওয়াবীনের। তিনি বিশ শতকের চল্লিশ দশক পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।

মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, ‘এই তিন বোনই ‘পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি’ ভাড়া করে ১৮৮০ সালের নভেম্বরে টিকিটের বিনিময়ে ইন্দ্রসভা নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। ঢাকায় মহিলাদের নিয়ে এটিই ছিল প্রথম নাট্যাভিনয়। আচ্ছি বাই ছিলেন নওয়াব আবদুল গনির সবচেয়ে নামকরা বাইজি। লখনৌ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। নৃত্য ও গীতে সুনিপুণা আচ্ছি ছিলেন অনেকের ওস্তাদ।’ আর হাকিম হাবিবুর রহমান লিখেছেন, ‘ঢাকায় আচ্ছি বাইয়ের মতো বড় নর্তকী তার পরেও কেউ আসেনি। ১৯১৪-১৫ সালের দিকে তিনি মারা যান।’

ওয়াসু, বাতানী, জামুরদ, হীরা পান্না, ইমামী এবং তিনজন হিন্দু বাইজি অতুল, লক্ষ্মী ও কালী বাই। হাকিম হাবিবুর রহমান তার লেখায় উল্লেখ করেছেন আখের খুকী নামের একজন খেমটাওয়ালির কথাও। তিনি খেমটা নাচ প্রদর্শন, বাংলা গান ও হিন্দি ঠুমরি গেয়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। আমিরজান বাইজি ছিলেন উনিশ শতকের ঢাকার বিখ্যাত গায়িকা ও নর্তকী।
জিন্দাবাহারের রাজলক্ষ্মীও ছিলেন ঢাকার আরেক বিখ্যাত বাইজি। জিন্দাবাহারে তাঁর পাঁচ-ছয়টি বাড়ি ছিল। সংগীতশিল্পীর চেয়ে দান-ধ্যানের জন্য তিনি ছিলেন অধিক সম্মানিত। ১৮৮৬ সালে ভূমিকম্পের পর জিন্দাবাহারের কালীবাড়ি ভেঙে গেলে তা মেরামত করে দেন তিনি। রমনার কালীবাড়িও সাজানোর জন্য তিনি মোটা চাঁদা দিয়েছিলেন।
মুনতাসীর মামুন ‘আমিরজান ও রাজলক্ষ্মী’ সম্বন্ধে একটি চিত্তাকর্ষক তথ্য দিয়েছেন, ‘১৮৭৪ সালে নওয়াব আবদুল গনি ঢাকা শহরে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য এক বৈঠকের আয়োজন করেন। সেই বৈঠকে রাজা-মহারাজা জমিদার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এই দুজন বাইজিও উপস্থিত ছিলেন। নবাব পানি সরবরাহ প্রকল্পে সবাইকে কিছু অর্থ সাহায্য করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। সে আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন মাত্র দুজন বাইজি। আমিরজান ও রাজলক্ষ্মী বাইজি। তারা প্রত্যেকে ৫০০ টাকা করে দান করতে রাজি হয়েছিলেন। নবাব অবশ্য পরে কারও কাছ থেকে কোনো সাহায্য না নিয়ে নিজেই এক লাখ টাকা দান করেছিলেন।’

উনিশ শতকের নব্বইয়ের দশকের দিকে ঢাকায় এসেছিলেন সিনেটের গনিউর রাজা। সে সময় ঢাকায় মধ্যবিত্তের বিনোদনের তেমন সুস্থ ব্যবস্থা ছিল না। তবে ঢাকা তখন বাইজিদের জন্য বিখ্যাত। গনিউর রাজা তাঁর আত্মজৈবনিক রচনায় বর্ণনা সীমিত রেখেছেন এই বাইজি এবং খেমটাওয়ালিদের মধ্যে। তিনি খেমটাওয়ালিদের একটি বর্ণনা দিয়েছেন, ‘সহর ঘুরিতে ২ অপরাহ্নে কিঞ্চিত জলযোগ করিলাম, ও আরও বেড়াইয়া প্রায় ৭টার সময় সাচিবন্দর সারদা নাম্নী খেমটাওয়ালির দুতালার উপরে উঠিলাম। ও উক্ত খেমটাওয়ালিকে গান-বাজনার যোগাড় করিতে সোপর্দা, ছামাজি ইত্যাদিকে ডাকাইয়া আনাইবার কথা বলিলাম, ‘ও হুইচকি ব্রান্ডি সুডা ওয়াটার ইত্যাদির জন্য কতেক টাকা দিলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই সমস্তের যোগাড় হইয়া গেল।’

গনিউর রাজা আরও বর্ণনা দিয়েছেন, ‘ছামাজি সারঙ্গ বাজাইতে লাগিল, সোপর্দা তবলা বাজাইতে আরম্ভ করিল ও মদ্যপায়ীদের মধ্যে ৫/৭ যে জনা হইয়াছিল তন্মধ্যে খেমটাওয়ালিই একজনকে ছাকি [পান পাত্র দাতা] নিযুক্ত করিল, ও সুডা ওয়াটার খুলিয়া মিশ্রিত করিয়া আমরাসহ প্রায় ৮/১০ জনাকে ক্রমান্বয়ে পাত্র বিলি করিতে লাগিল। ওদিকে খেমটাওয়ালি গান আরম্ভ করিল, ও সোপর্দা, ও ছামাজি ইত্যাদি একযোগে সাদত করিতে আরম্ভ করিল। গানবাদ্য খুব জমিল, সুরাপাত্রও অনবরত চলিতে লাগিল।’
তবে খেমটাওয়ালি প্রসঙ্গে গনিউর রাজার বলা একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়, ‘একদিন তিনি সরলা নামের খেমটাওয়ালির বাড়িতে ‘গান-বাজনা’ শুনতে গিয়েছেন। সবাই চলে গেলে খেমটাওয়ালি তাঁকে বলেছিল, ‘তুমি যে মুসলমান, তাহা আমি পূর্বেই বুঝিয়াছি, আমরা হিন্দু রমণী মুসলমানকে জায়গা দেই না, সমাজে দূষিত হইতে হয়। আমি বলিলাম, তোমাদের আবার সমাজ আছে নাকি? সে বলিল, থাকিবে বই কি, যদিও আমরা নাম লিখাইয়ছি তথাপি আমাদের হিন্দুয়ানি সবই বজায় আছে।’ তাদের নৃত্য ও কণ্ঠের মাধুর্যের বর্ণনার পাশাপাশি গনিউর রাজা খেমটাওয়ালিদের দৌরাত্ম্য ও অন্ধকার জীবনের কথাও উল্লেখ করতে ভোলেননি।
বিশ শতকের প্রথম দিকে ঢাকার সবচেয়ে বিখ্যাত বাইজি ছিলেন জিন্দাবাহার লেনের দেবী বাইজি বা দেবী বালা। ঢাকার নবাব পরিবারের খাজা মওদুদের ডায়েরি থেকে জানা যায়, ’১৯১৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে খাজা হাবিবুল্লাহর বিয়ের অনুষ্ঠানে দেবী বাইজি ও অন্য এক বাইজি নাচ-গান করেছিলেন। দেবী বাইজি পরে প্রথম ঢাকায় নির্মিত পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র (নির্বাক) দ্য লাস্ট কিস-এ অভিনয় করেন। হরিমতি বাইজি ঢাকায় এসে ছিলেন। তিনিও এই নির্বাক ছবিটিতে অভিনয় করেন।’

শিল্পী পরিতোষ সেন তাঁর আত্মজৈবনিক রচনা জিন্দাবাহারে এক হরিমতি বাই সম্পর্কে লিখেছেন, ‘হরিমতি বাঈজীর ঘরটি আমাদের বারান্দা থেকে পরিষ্কারই দেখা যায়। প্রতিদিনের অভ্যাসমতো ভৈরবী রাগে গান ধরেছেন, “রসিয়া তোরি আখিয়ারে জিয়া লালচায়’ ঠুংরি ঠাটের গানের এ কলিটির সুরের মাধুর্য্যে আমাদের জিন্দাবাহার গলিটি কানায় কানায় ভরে উঠেছে।’

ইংরেজ শাসন স্থায়ী হওয়ার পর বাইজি পেশায় ধীরে ধীরে ধস নামে। ঢাকার বাইজি পাড়ায়ও লাগে এর হাওয়া। নবাব, জমিদারদের আয়ের উৎস কমে যেতে থাকে। তাদের পৃষ্টপোষকতা করা আর সম্ভব হয়নি। ধনিক শ্রেনীর সৃষ্টি হয়, এরা বাইজিদের নাচ-গান উপভোগের চেয়ে শ্বেতাঙ্গ রমনীদের সঙ্গে বলড্যান্স উপভোগ করতে অধিক অর্থ ব্যয় করতে উৎসাহী হয়ে উঠেন। বাইজিরা হারিয়ে যেতে থাকে আর প্রকৃত বাইজির অবর্তমানে এক শ্রেনীর নকল বাইজির উদ্ভব ঘটে। নৃত্যগীত নয়, রুপ যৌবন ছিল তাদের মূল সম্পদ। আঁটসাঁট শরীরে নাচগানের মধ্যেই খরিদ্দাররা তাদের শরীর স্পর্শ করতে পারত। বাকী ইতিহাস অনেক করুণ ও বেদনাময় কালের সাক্ষী। কেউ জানে, কেউ বা রয় কল্পনায়।

বাইজিদের হাসি, গান আর আনন্দের পেছনে লুকিয়ে ছিল অনেক কান্না, বেদনা আর দীর্ঘশ্বাস। কারও জন্ম ঘোর অন্ধকারে ঢাকা। অথচ এর জন্য তার কোনো হাত নেই। কেউ প্রতারিত হয়ে পথের ভিখারি হয়ে শেষ জীবন কষ্টে কাটিয়েছেন। যাঁরা ভাগ্যবান, তাঁরা স্বীকৃতি পেয়ে বেগম হতে পেরেছেন। আবার এঁদের কুহকের বলি হয়েছে অনেকের সংসার, জীবিকা ও জীবন। ঢাকার বাইজিদের দিন গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকেই ফুরিয়ে যেতে থাকে।


বাইজি নাচ ও খেমটা নাচ সেকালে ঢাকার মানুষের জীবনের অংশ হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন স্থান থেকে আগত এসব অস্থায়ী বাইজির পাশাপাশি স্থানীয় মেয়েরাও বাইজির পেশা বেছে নিত। সংগীতের পুরনো কেন্দ্র হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই ঢাকায় ছিলেন কয়েকজন অতি গুণী বাইজি। ঢাকায় বাইজিদের পাশাপাশি খেমটাওয়ালিদের-ও যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ছিল।
বাইজি নাচ গান আর খেমটা নাচ গানের মধ্যে পার্থক্য আছে। খেমটা হলো হালকা ধরনের এবং আদিরসাত্মক নৃত্য। এই নাচ সাধারণত বাইজিরা এককভাবে নাচতেন। এককভাবে সংগীতও পরিবেশন করা হতো খেমটা নাচের সঙ্গে। খেমটা ও বাইজি নাচের মধ্যে মূল প্রার্থক্যটা, পায়ের কাজ। আর অন্যদিকে বাইজি নাচে প্রধান ছিল, হাতের ছন্দময় দোলা এবং মুখ, চোখ, নাক ও ঠোঁটের সূক্ষ কম্পন ও বিভিন্ন ভাবপ্রকাশের আয়োজন। বাইজিদের পোষাক ছিল চুড়িদার পাজামা-ওড়না পায়ে চিকন ঘুঙুর ।
বাইজিরা শুধু তাদেরও জীবনকে পতিতাবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি, উপমহাদেশের সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত, ‘ফাস্ট ডান্সিং গার্ল’ নামে পরিচিত গহরজান বাইজি শুধু গায়িকা-নৃত্যশিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন স্বয়ং কবি ও গানের শিক্ষক। ‘দেবী’ নামে এক বাইজি পরে প্রথম ঢাকায় নির্মিত পূর্ণাঙ্গ নির্বাক চলচ্চিত্র ‘দ্য লাস্ট কিস’-এ অভিনয় করেন।
অনেক সঙ্গীতজ্ঞ মনে করনে, রবীন্দ্রসঙ্গীত জনপ্রিয় করবার পেছনে গণিকা ও বাইজি গায়িকাদের অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। শোনা যায়, রবীন্দ্র সংগীতের সুর পরিবর্তন করে তারা তাদের মত করে রবীন্দ্র সংগীত গাইলেও স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও কিছু মনে করতেন না। কথিত আছে প্রথমে নিজের কন্ঠে গান শোনার ব্যাপারে আপত্তি থাকলেও, একবার স্বামী বিবেকানন্দ এক বাইজির গান শুনে ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন। কবি নবীন চন্দ্র সেন তার ছেলের বিয়েতে ঢাকা থেকে বাইজি আনতে পেরে অত্যন্ত গর্ব অনুভব করেছিলেন।
পরবর্তীকালে ধর্মালয়ে নারীর পরিবর্তে পুরুষ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হলে এই সেবাদাসীদের কাজ হয়, দেবতার বা মন্দিরের বদলে পুরুষ পুরোহিতদের এবং মন্দিরের ধনী পৃষ্ঠপোষকদের নাচ-গান দিয়ে বিমোহিত করে তাদের যৌনাকাঙ্খা পূরণ করা। বলা বাহুল্য ভারতীয় অধিকাংশ শাস্ত্রীয় নৃত্যকলার উৎস মন্দিরে দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসগকৃত নাচ। একদা মন্দিরে দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত নৃত্য থেকেই বিভিন্ন ধারার নৃত্য চালু হয়েছে।

সহায়ক

ঢাকার বাইজি উপাখ্যান- সম্পাদনায় আরিফ নজরুল

ঢাকার বাইজি : যেন বিস্মৃতির এক বিষাদময় ইতিকথা- আসাদুজ্জামান স্বপ্ন

Video

Follow Me

Calendar

May 2021
M T W T F S S
« Jan    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31