ট্রাভেল

ডেভিলস টাওয়ার: রহস্যে ঘেরা অনন্য এক পর্বত

ডেভিলস টাওয়ার
ডেভিলস টাওয়ার source: Getty

সাদিক উল ইসলাম

বিশ্বজুড়ে রয়েছে হাজারো অদ্ভুত প্রাকৃতিক নিদর্শন। যা একাধারে মানুষকে করে তোলে মুগ্ধ এবং বিস্মিত। তেমনি বিস্ময়কর এবং রহস্যে ঘেরা এক প্রাকৃতিক নিদর্শন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইয়োমিং রাজ্যের ‘ডেভিলস টাওয়ার’। যা পর্বতারোহীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

ডেভিলস টাওয়ার। source: outside

ডেভিলস টাওয়ার প্রথম চোখে পরতেই যে কারো মনে হতে পারে এটি প্রাচীন কোন স্থাপত্য। তবে তা একদমই নয়, এটি সম্পূর্ণই একটি প্রাকৃতিক নিদর্শন। এমন ভুল হতে পারে এর নাম শুনেও। এই নিদর্শনটির নাম ডেভিলস টাওয়ার। কিন্তু নামে টাওয়ার হলেও এটি আসলে আগ্নেয় শিলার দ্বারা গঠিত একটি পর্বত।

ডেভিলস টাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইয়োমিং রাজ্যের ৫.৪ বর্গ কি.মি জায়গা জুড়ে অবস্থিত। এটির উচ্চতা ভূপৃষ্ঠ থেকে ৮৬৭ ফুট (২৬৫ মিটার) এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫১১২ ফুট (১৫৫৯ মিটার) উপরে অবস্থিত। এই পর্বতের সমতল চূড়ার আয়তন প্রায় ১.৫ একর। দেখতে অনেকটা গাছের গুড়ি বা ফাঁপা মনে হলেও এটি আসলে নিরেট পর্বত।

source: Wiki

ভাবছেন তো, অদ্ভুত এই নামটি তবে কিভাবে আসলো? ডেভিলস টাওয়ার নাম করণের পদ্ধতিটা ছিল ভিন্ন ধরনের। আমেরিকার কর্নেল রিচার্ড ইরভিং ডজের নেতৃত্বে ১৮৭৫ সালে ভূতত্ত্ববিদ ওয়াল্টার পিজেনি ব্ল্যাক হিল অঞ্চলে ভূতাত্ত্বিক গবেষণা পরিচালনা করার এক পর্যায়ে তারা জানতে পারেন ঐ অঞ্চলে স্বর্ণ খণ্ডিত আছে। তবে তারা বহু অনুসন্ধান শেষেও কোন ধরনের স্বর্ণ খুঁজে পেলেন না। কিন্তু যা খুঁজে পেলেন তা হল ডেভিলস টাওয়ার।

এই টাওয়ারের সৌন্দর্য দেখে তারা রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেলেন। একে অনায়াসেই বিশ্বের সবচেয়ে অসাধারণ চূড়া গুলোর একটি বলে উল্লেখ করেন কর্নেল ডজ। আমেরিকার স্থানীয় বাসিন্দারা এই টাওয়ারকে হোম অফ বিয়ার বা ভাল্লুকের বাসস্থান বলে। তবে যে ব্যক্তি তাদের দেওয়া নামের অনুবাদ করেন, তিনি ভুলবশত খারাপ দেবতার টাওয়ার অনুবাদ করে ফেলেন। আর এই অনুবাদকে কেন্দ্র করে কর্নেল ডজ টাওয়ারটির নাম দেন ডেভিলস টাওয়ার। যদিও এরপর এটি বিশ্বব্যাপী ডেভিলস টাওয়ার নামে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

১৯৯০ সালে তোলা ছবি। source: Wiki

ডেভিলস টাওয়ার সম্পর্কে অনেক ধরনের মতবাদ প্রচলিত আছে। স্থানীয়দের ভাষায়, ভাল্লুক থেকে বাঁচতে স্থানীয়রা একটা পাথরের ওপর উঠে এবং তাদের মহৎ আত্মার কাছে প্রার্থনা করে। মহৎ আত্মা তাদের প্রার্থনা শুনতে পায় এবং তাদের বাঁচাতে পাথরটিকে স্বর্গের দিকে প্রসারিত বা উঁচু করে দেয়। ভাল্লুকেরা তারপরও উঠতে চেষ্টা করলে ভাল্লুকের নখের আচরে টাওয়ারের গায়ে খাঁজকাটা আকৃতিতে পরিণত হয়। স্থানীয়দের নিকট এর নাম ভাল্লুকের পাহাড় বা আস্তানা বলেও পরিচিত।

সায়ান ইন্ডিয়ানদের মতে, ভাল্লুকেরা ঐ অঞ্চলের সব মেয়েদের মেরে ফেলে, তাদের ভেতর বেঁচে যাওয়া দুটি মেয়ে নিজ বাসস্থানে ফিরে এসে ছেলেদের ঘটনাটি বলে। এরপর তারা তাদের ধর্মগুরুর মাধ্যমে জানতে পারে, ভাল্লুকের পায়ের নিচে আঘাত করতে পারলেই ভাল্লুকগুলোকে মারা সম্ভব। ছেলেরা বুদ্ধি করে ভাল্লুক গুলোকে চূড়ার কাছে নিয়ে যায় এবং ভাল্লুকগুলো ভাবে ছেলেগুলো চূড়ার উপরে রয়েছে। ভাল্লুকেরা চূড়ায় ওঠার জন্য বারবার চেষ্টা করতে থাকে ফলে চূড়ার গায়ে নখের আচর দেখা যায়। এক সময় ছেলেদের ছোড়া তীর ভাল্লুকের পায়ের খুব কাছে লাগে এবং ভাল্লুকেরা ভয়ে পালিয়ে যায়। এভাবে উৎপত্তি হয় এই চূড়ার।

বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ বিশ্বাস করে এই টাওয়ার বহির্জাগতিক শক্তির সৃষ্টি আর এলিয়েন স্পেস শীপ ল্যান্ডিং স্টেশন ছিল।

এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আবার ভিন্ন। বিজ্ঞানীদের মতে, বিজ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর উন্নতির সাথে সাথে ডেভিলস টাওয়ার নিয়ে এক আধুনিক তত্ত্বের জন্ম হয়েছে। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ বিশ্বাস করে এই টাওয়ার বহির্জাগতিক শক্তির সৃষ্টি আর এলিয়েন স্পেস শীপ ল্যান্ডিং স্টেশন ছিল।

ভৌগলিকবিদের মতে, ডেভিলস টাওয়ার আজ থেকে প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে ম্যাগমা বা লাভা সঞ্চিত হয়ে, টেকটনিক প্লেটের চাপে যখন রকি মাউন্টেনের উত্থান হয় তখন জমে যাওয়া এই ম্যাগমা খণ্ডটি উঠে আসে, পরে হাজার বছর ধরে রোদ, বৃষ্টি, বাতাসের প্রভাবে মাটি খয়ে যায় এবং জমাট বাধা এই ম্যাগমার চূড়াটি দৃশ্যমান হয়।

১৯০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম জাতীয় সৌধে পরিণত হয় ডেভিলস টাওয়ার। কয়েক দশক ধরে এই ডেভিলস টাওয়ার মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সর্বপ্রথম এই পর্বতটি উইলিয়াম রজার্স এবং উইলার্ড রিপ্লি শীর্ষ বিজয় করেন। ডেভিলস টাওয়ার দেখতে দুর্গম মনে হলেও পাহাড়টি পর্বতারোহীদের পছন্দের জায়গা। ক্লাইম্বিং এর জন্য প্রতি বছর হাজারো মানুষ ছুটে আসে। এছাড়া এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও উপভোগ করার মতো। তবে স্থানীয় ধর্মীয় নীতি-রীতি অনুযায়ী জুন মাসে আরোহণ বন্ধ থাকে।

এর চূড়ায় কাঠবিড়ালি, ইঁদুর জাতীয় প্রাণী এবং নানান জাতের পাখির নিবাস। এছাড়াও পাহাড়ের পাদদেশে কয়েক প্রজাতির প্রেইরি ডগও পাওয়া যায়। বিস্ময়কর জিনিসের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বরাবরই একটু বেশি। তাইতো এই অদ্ভুত ডেভিলস টাওয়ার বা পাহাড় দেখার জন্য প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ পর্যটন হাজির হন।

source: magnificentworld

Video

Follow Me

Calendar

October 2021
M T W T F S S
« Aug    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031