পর্যবেক্ষণ

‘টেস্ট অব চেরি’ এবং ‘থ্ররু দ্য অলিভ ট্রিস’: নিঃসঙ্গতার সাতকাহন

পিয়াস মাজিদ

ইরানী চলচ্চিত্রকার আব্বাস কিয়োরোস্তামির ‘টেস্ট অব চেরি’ এবং ‘থ্ররু দ্য অলিভ ট্রিস’- উভয় সিনেমাই দুনিয়া জুড়ে আলোচিত সমালোচিত। দুটো সিনেমার ঝুঁলিতেই রয়েছে বহু প্রশংসা আর পুরস্কার

হঠাৎ শেষরাতে ঘুম ভেঙে গেল। পুনরায় ঘুমোবার চেষ্টা না করে বহুদিন বাদে আবারও আব্বাস কিয়োরোস্তামির ‘টেস্ট অব চেরি’ সিনেমাটা দেখা শুরু করলাম। বাইরে আধো আলো- আধো আঁধারির সঙ্গে সিনেমাটারও কী ভীষণ মিল! সংলাপ আছে তবু যেন নৈঃশব্দ্যের রাজত্বই বেশি। চলমান ব্যক্তিগত গাড়িতে সিনেমার অনেকটা অংশ চিত্রায়িত তবে যানবাহনের গতির বিপরীতে মানুষ-জীবনের নিস্তরঙ্গতাই যেন বেশি পরিস্ফুট৷ একটা একাকী লোক, নিজের জীবনের ইতি টানতে রীতিমতো আয়োজনে নেমেছে৷ পথে পথে পারিতোষিকের বিনিময়ে লোক খুঁজছে, যে তার মৃত্যু নিশ্চিত করবে৷

টেস্ট অফ চেরি পোস্টার source: movieposteroftheday.tumblr.com

কিন্তু কী আশ্চর্য, এই মৃত্যুচিহ্নিত পৃথিবীতে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তে মৃত্যুও যেন অধরা হয়ে পড়ে। ছাপোষা সেনা-কর্মচারী, শাস্ত্র-শিক্ষার্থী কেউ তাকে মৃত্যুর অমৃত-স্বাদ দিতে পারগ নয়। তাদের একজন পাগল ঠাউরে তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ায়, অন্যজন আত্মনাশের বিরুদ্ধে নানা কথা বলে তাকে বেঁচে থাকতে উদ্বুদ্ধ করতে আগ্রহী, যে বেঁচে থাকা আসলে বেদনা যাপন করা। মরতে ব্যাকুল লোকটা শেষমেষ মি.বাঘেরি বলে এক জাদুঘর-কর্মীকে খুঁজে পায় যে তাকে তার মৃত্যুস্বাদ দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় কিন্তু আলগোছে জানায় নিজের জীবনের আত্মহত্যাকামী অতীতের কথাও যেখান থেকে তাকে ফিরিয়ে আনে এক বুনো ফলের স্বাদ। গাছের তলায় মৃত্যুফলের স্বাদ নিতে গিয়ে সে ফিরে এসেছে জীবনফল চাখতে চাখতে৷ পরের দিন ভোর না হতেই সে মৃত্যুপ্রত্যাশী লোকটা যায় তার নির্বাচিত মৃত্যু -স্থলের দিকে।

সিনেমাতে তখন আলো-আঁধারির খেলা; ঠিক যেমন মানুষের জীবন। তারপর আলো-ফোটা সকালে সেই জায়গায় প্রশিক্ষণরত সেনাদলের কোরাস-মুহূর্তকে ক্যামেরায় ধারণ করতে দেখা যায় এক ফিল্ম বা ডকুমেন্টারি গ্রুপকে।

টেস্ট অব চেরির মূল ভূমিকায় হুমায়ূন এরশাদী। সিনেমায় যার নাম থাকে বাদিল

আরে আরে, দলে তো মনে হয় সেই মৃত্যুকামী লোকটাকেও দেখা গেল কার সাথে যেন আয়েশী ভঙ্গিতে সিগারেট বিনিময় করছে। ফাঁকা প্রান্তর, মহাসড়কের নির্মাণকাজ, সেনাদলের মহড়া, ছবি তোলার হিড়িক আর তার চেয়ে বেশি একটি নতুন ভোরের বাঁশির শব্দ দর্শকের কাছে কোনোভাবেই প্রধান রাখে না সে-ই প্রশ্ন যে মৃত্যুকামী লোকটা মরল নাকি বেঁচে থাকল? আর বাঁচলে কীভাবে তার জীবন-রসদের সন্ধান পেল- সে উত্তর সিনেমার উপান্তে আর জরুরি থাকেনা দর্শকের কাছে বরং এক স্বপ্নের চেয়ে এক চরম বাস্তবের স্বাদে ভরে ওঠে আমাদের মন; যে-বাস্তবে মিশে আছে যুগপৎ নিস্তব্ধ রাত্রি আর ভোরের কাকলি।

একই দিনে দেখা হল দু-দুটো কিয়োরোস্তামি। সকালে ‘টেস্ট অব চেরি’, বিকেল-সন্ধ্যায় ‘থ্রু দ্য অলিভ ট্রিস’। কিয়োরোস্তামির পটভূমি ইরান অথচ সিনেমা দেখতে দেখতে মনে হবে এক স্থানিক স্থাননিরপেক্ষ মাটিজল আর দিগন্তে চলে তার সিনেমার পেইন্টিং। পেইন্টিং তো বটেই; তার ধীরে বহে যাওয়া চলচ্চিত্র-পরিভাষা তো আমার কাছে কবিতার বেশি চিত্রকলা। ‘থ্রু দ্য অলিভ ট্রিস’ আমি শেষ থেকে খানিক দেখে আবার শুরু থেকে মাঝখান পর্যন্ত দেখলাম; মূলত তার তেলরং, জলরং আর মিশ্রমাধ্যমের খেলা বোঝার জন্য।

থ্রু দ্য অলিভ ট্রিস পোস্টার source: impawards.com


হোসেন নামে এক আপাত শিক্ষাবঞ্চিত আর চালচুলোহীন তরুণ তাহেরির প্রেমে পড়ে। তাহেরি ভূমিকম্পে তার মাবাপ-হারানোর পর কবরখানায় দেখা হোসেনের দিকে কোন দৃষ্টিতে যেন তাকিয়েছিল। ব্যাস, সেই ভরসায় বারেবারে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও হোসেন প্রত্যাশা করে তাহেরি একান্ত তার হবে৷ একটা ফিল্মের দলে হঠাৎ ঢুকে হোসেন৷ পরিচালক মশাই হোসেনের অভিলাষ দেখে আর তাহেরির প্রত্যাখানও দেখে৷ তিনি হোসেনকে পরামর্শ দেন, যেহেতু সে নিজে শিক্ষাদীক্ষাহীন এবং দরিদ্র সেহেতু সে যেন তার সমগোত্রীয় কোনো মেয়েকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়। কিন্তু তখনই প্রকাশ পায় হোসেনের শিক্ষিত আর সম্পন্ন অন্তর; সে সরল ও সঙ্গতভাবে চিন্তা করে ‘শিক্ষিত আর অশিক্ষিত, দরিদ্র আর ধনীদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হলেই সমাজ সুস্থ হবে।’ পরিচালকের বদান্যে তাহেরির সঙ্গে একই সিনেমায় শিক্ষানবিশ অভিনেতা হোসেন অভিনয় করে৷ মজার ব্যাপার, ফিল্মে তারা স্বামী স্ত্রীর ভূমিকায় ; বাস্তবে তাহেরি তো হোসেনের কাছে দূরদ্বীপবাসিনী।

হোসেন চরিত্রে হোসেন রেজাই source: IMDb
তাহেরি চরিত্রে তাহেরি লাদানিয়ান source: IMDb

ফিল্মের ব্রেক-আওয়ারে হোসেনকেই সবার জন্য চা পরিবেশন করতে হয়। সে সবাইকে চা দিয়ে দু’কাপ চা নিয়ে তাহেরির সামনে রাখে, সঙ্গে একটা ফুল আর বলে সংসার বলতে তার কাছে -এমন সুগন্ধির ছোঁয়া আর মুখোমুখি বসিবার অবসরের ধারণা। এমন অনায়াস তার এইসব উচ্চারণ যে মনে হবে সে যেন অল্পবয়সেই ক্লান্তপ্রাণ এক, শ্রান্তির পর ‘সংসার’ নাম্নী একটু লাবণ্যের তরে আকুল হয়ে আছে। আর বিপরীতে তাহেরি গোটা সিনেমায় প্রায় নিঃশব্দ; যেমনটি কিয়োরোস্তামির বহু প্রধান চরিত্রই যেমন বোবা-ভাষার অনুরাগী যা যেকোনো কল্লোলের চেয়ে বেশি অভিঘাত-সঞ্চারী।

ইরানী সিনেমার লিডার আব্বাস কিয়োরোস্তামি source: CGTN

সিনেমা শেষ হয়ে আসে। বিস্তীর্ণ প্রান্তরের দিকে তাহেরি হেঁটে চলে। তার পিছু পিছু হোসেন। হোসেন জানতে চায়, তাহেরির কণ্ঠে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’। তাহেরি নির্বাক। সব কি বলা যায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এ! তাহেরি জোরে চলে। হোসেনও তার হাঁটার গতি বাড়ায়৷
তাহেরি এবার দৌঁড়ায়। হোসেনও ধায়।
হোসেন। তাহেরি৷
তাহেরি। হোসেন৷
তাহেরি মিলিয়ে যায় কোথায়।
কে ফিরে আসে? হোসেন একা নাকি তাহেরিও সাথে!
দর্শকের কৌতূহল আর সেদিকে থাকে না। বরং বিকেলের সন্ধ্যার দিকে গড়িয়ে পড়া
আর অলিভ-গাছের ছায়াচ্ছন্ন উপকূলে গোধূলির আছড়ে পড়ার দৃশ্যে কী মধুর বিদ্ধ হতে থাকে সে; কিয়োরোস্তামির দর্শক।

Video

Follow Me

Calendar

October 2020
M T W T F S S
« Jun    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031