ইতিহাস প্রযুক্তি

জলবসন্ত বিলুপ্তির গল্প

মেহেদী হাসান শান্ত 

বর্তমান বিশ্বে চলছে করোনা মহামারীকাল। একসময় জলবসন্তও পৃথিবীতে মহামারী আকারে ধারণ করেছিল। জলবসন্ত বা চিকেন পক্স রোগটির সঙ্গে সকলেই কম বেশি পরিচিত। অনেকেই জীবনে একবারের জন্য হলেও এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু গুটিবসন্ত নামের অন্য এক প্রকার বসন্ত সম্পর্কে আমরা ক’জনই বা জানি হ্যাঁ, চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এক সময়ের প্রাণঘাতী এই মহামারী এখন পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত। কিন্তু তাই বলে ইতিহাস থেকে এ রোগ বিদায় নেয়নি। অষ্টাদশ শতকে গুটিবসন্ত ছিলো এক ত্রাসের নাম। গুটিবসন্ত আক্রান্ত রোগীর সারা শরীর ছোট ছোট গুটি বা ফুঁসকুড়িতে ভরে যেত। সেসব গুটির ভেতর জমা হত দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ।

এ রোগটি ছিলো ভয়ানক ছোয়াঁচে। গুটি ফেটে গিয়ে পুঁজ যদি অন্য কারো দেহে সামান্য পরিমাণেও লাগতো, তবেই কাজ সারা! সেই সুস্থ ব্যক্তিও তখন আক্রান্ত হতো মারাত্মক এই রোগে, ঢলে পড়ত মৃত্যুর কোলে। পুরো পৃথিবীজুড়ে তখন সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ, কীভাবে এ মৃত্যুদূতের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

গুটিবসন্তের কিছু কিছু চিকিৎসা যে প্রচলিত ছিলোনা তা কিন্তু নয়। গুটিবসন্ত আক্রান্ত ব্যক্তির শুকনো গুটি থেকে মরা চামড়া তুলে সুস্থ মানুষের শরীরে লাগিয়ে দেয়া হতো। এর ফলে সুস্থ ব্যক্তিটি কিঞ্চিৎ গুটিবসন্তে আক্রান্ত হতো এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার তৎপরতার কারণে গুটিবসন্তের সেই হালকা আক্রমণ রোধ করা যায়। শরীর যদি একবার হালকা গুটিবসন্ত প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়, তবে পরবর্তীতে আর ‘সিরিয়াস’ গুটিবসন্ত হয় না। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ভ্যারিওলেশন। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় ছিলো অনেক বিপত্তি। অনেক সময় টিকা গ্রহণকারী ব্যক্তি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কিঞ্চিৎ গুটিবসন্তের বদলে সিরিয়াস গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে পড়ত। এ কারণে ভ্যারিওলেশন প্রক্রিয়ায় ছিলো অনেকের অনীহা।

সেসময় ইংল্যান্ডের গ্লস্টারশায়ারে বাস করতেন এডওয়ার্ড জেনার নামক এক চিকিৎসক। গুটিবসন্তের কার্যকরী চিকিৎসা আবিষ্কারে অনেকের মতো তিনিও গলদঘর্ম হচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় হঠাৎ একদিন তিনি শুনতে পান, তার বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক গোয়ালিনী চিৎকার করে বলছে, ‘আমার গোবসন্ত হয়ে গেছে, তাই আর কোনোদিন গুটিবসন্ত হবে না! ‘ব্যাপারটি ভাবিয়ে তুলল জেনারকে। তিনি একটু খোঁজ চালিয়ে দেখতে পেলেন, ইতোমধ্যে যেসব গোয়ালা-গোয়ালিনী গোবসন্তে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের গুটিবসন্ত হচ্ছেনা। উল্লেখ্য, গোবসন্ত হচ্ছে মূলত গরুর দেহে হওয়া এক ধরণের বসন্ত রোগ, যার জীবাণু মানুষের দেহেও ছড়িয়ে পড়ে মানুষেও গোবসন্ত দেখা দিতে পারে। কিন্তু মানুষের ওপর গোবসন্তের প্রভাব খুবই সামান্য, গুটিবসন্তের মতো ভয়ানক কিছু নয়। গোবসন্ত অল্পতেই সেরে যায়। কিন্তু এ জীবাণুর সবচেয়ে কল্যাণকর দিক হলো, এর আকার আকৃতি অনেকটাই গুটিবসন্তের মতো। গোবসন্তের জীবাণু যখন মানুষের দেহে প্রবেশ করে, তখন আমাদের শ্বেতরক্তকণিকা সেগুলোকে ধ্বংস করে দেয় এবং শ্বেতরক্তকণিকার স্মৃতিকোষ ওই জীবাণুটিকে চিহ্নিত করে স্মৃতিতে জমা রেখে দেয়। পরবর্তীতে, যখন অধিক ভয়ানক কিন্তু একই রকম দেখতে গুটিবসন্তের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে, দেহের প্রতিরক্ষা কোষগুলো আগে থেকেই সেগুলো চিহ্নিত করতে পারে এবং রোগী আক্রান্ত হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। এই ছিলো এডওয়ার্ড জেনারের ভাবনা। কিন্তু শুধু ভাবলেই তো হবে না, সেটিকে তো কাজে পরিণত করতে হবে! তবেই না সেটি হবে আবিষ্কার।

এডওয়ার্ড জেনার, ছবিসূত্র : উইকিপিডিয়া

এডওয়ার্ড জেনার যখন তার আবিষ্কার পরীক্ষা করে দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন, এমন সময় তিনি জানলেন যে তার মালীর ছেলে ‘জেমস’ এই ব্যাপারে তাকে সাহায্য করতে আগ্রহী। তিনি তার বাসায় দুধ সরবরাহকারী গোয়ালিনী সারা; যে গোবসন্তে আক্রান্ত হয়েছিলো, তার শরীর থেকে পুঁজ নিয়ে জেমসের শরীরে ঘষে দেন। এর ফলে জেমস গোবসন্তে আক্রান্ত হয়। হালকা জ্বর এসে ক’দিন বাদেই সুস্থ হয়ে যায় জেমস। এবার এলো আসল পরীক্ষার পালা। জানতে হবে গুটিবসন্তের টিকা হিসেবে গোবসন্তের জীবাণু ঠিক কাজ করে কি-না। সুস্থ জেমসের দেহে এবার জেনার পুশ করলেন আস্ত গুটিবসন্তের জীবাণু! ফলাফলে তাজ্জব হয়ে গেলো সকলেই! কিছুই হলো না জেমসের। আগে একবার গোবসন্তের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করানোর ফলে তার দেহ গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে পেরেছে! এভাবেই আবিষ্কৃত হলো পৃথিবীর প্রথম ভ্যাক্সিন। একটি প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধে একই রকম দেখতে কিন্তু কম শক্তিসম্পন্ন জীবাণু শরীরে প্রবেশ করানোর প্রক্রিয়া তথা ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করে ইতিহাসে জায়গা পান এডওয়ার্ড জেনার। সেইসঙ্গে নির্মূল করা সম্ভব হয় গুটিবসন্তের মতো অভিশাপকেও।

Video

Follow Me

Calendar

October 2020
M T W T F S S
« Jun    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031