আর্টস

ছলাৎ

লুফাইয়্যা শাম্মী

মাইয়া মাইনষের এতো হাসতে নাই, বদনজর লাগবো। আশেপাশে যেমন বদমানুষে ভর্তি তেমনি বদজ্বীনেও ভর্তি

শরৎকাল। আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা দূরে নদীর বাঁকের জমিন ছোঁয়। সেইখানে ফুটে উঠে গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘফুল। এই বর্ষায় নদীর বুক আরো ভরাট হয়েছে, জোয়ারে জোয়ারে তার স্রোতের বেগ বেশ টের পায় রকিব মাঝি। মাঝির পরাণে আজ বড় সুখ। মুখে পান নিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে সে বৈঠা বায়। বৈঠার তালে তালে নৌকা দুলে। ঢেউ বয়, ছলাৎ শব্দে গান গেয়ে দরিয়ায় মিশে। পানের রসে টইটম্বুর মুখ নদীর স্বচ্ছ জলকেলিতে ভাঙা আয়নার মত কেঁপে কেঁপে উঠে। মাঝি কারণ ছাড়াই সন্তর্পণে বৈঠার আড়ালে পানের রসে থুক দিয়ে ফেলে দেয়, লাল রঙ ধীরে মিশে যায়, লাজুক চোখে মাঝি চেয়ে থাকে। সে লজ্জিত হয়, অযথাই, নদীর বুকে তো কত কিছুই ফেলে মানুষ!
আকাশের মেঘ ঝরে- যেন নদীর দুকূল ভাসিয়ে নেয়, থোকা থোকা সাদা মেঘ জমে থাকে কূল জুড়ে, ঝরে পরে বালুমাটির বুকে। বাতাসে উড়ে তার বিন্দু বিন্দু শুভ্র তুলোর ন্যায় পালকগুচ্ছ। কাশবনের দুলুনিতে মাঝির মন উদাস হয়, জনমের আনন্দ নিয়ে কাশবন নেচে যায় এসব ভাবলেই মন ক্যামন আনচান করে! পানের রসের চিন্তা বেশিক্ষণ তার স্থির হয় না। চারপাশের হাটবাজার-গ্রাম-ছোটবড় খেয়াঘাট পার হয়ে সে চলে আপন গাঙে। তার গ্রাম সোনাখালী এখান থেকে টানা আট ঘন্টার পথ জোয়ারের টানে, তাই হিসেব মতোন নৌকা বাইতে হয়। ভাটায় পড়লে কয় ঘন্টায় পথ উদ্ধার হবে সে চিন্তা মাঝি করতে চায় না কখনো। সে চলে জোয়ারে জোয়ারে, আয়েশ করে। সেই ভোরের আযানের সময় রওনা দিয়ে মাঝ দুপুরে যেয়ে পৌঁছায় মাঝি। সেখানকার কাজ সেরে এখন আবার নৌকায়, জোয়ারের টানে। তবুও একদিনের জন্য অনেক পথ এটা। তার নৌকাটা ছিপছিপে তন্বী যেন। কালো মিশমিশে গায় তারপিন চকচক করে, আজকের এই যাত্রার উদ্দেশ্যেই নতুন করে ধুয়ে মুছে কালো রঙে মালিশ করে তারপিনে চকচকে করে তুলেছে রকিব মাঝি। নদীর রূপালী জল ভেদ করে কালো তন্বী মেয়ে অল্প অল্প করে এগোয়। মাঝি খামখেয়ালি স্রোতের মেজাজ মর্জি বেশ বুঝে। ছোট ছোট ঢেউ নৌকার শরীরে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে পরে। অল্প অল্প করে এগুয় নৌকো। তাতে মাঝির কোনো সমস্যা নেই। এই নদী, এই মেজাজ তার বড্ড আপন। নদীই তার জীবন।  প্রতিদিন যখন নাও নিয়ে বের হয় তখন নিজেকে নতুন ভাবে তুলে ধরে নদীর কাছে, যেন নদী তার প্রেমিকা, সে এসেছে তার বুকে সাঁতার কাটতে। বুক চিড়ে অপরূপ সুষমা আকন্ঠ পান করে পরম তৃপ্তিতে। অবশ্য আজকের অবস্থা ভিন্ন। মাঝির চোখ মুখ রাঙা হয়, সূর্যাস্তের রাঙা আলোর রঙে ছেয়ে যায় তামাটে গাল, ভ্রুর লজ্জা টপটপ করে চোখ ভেজায়। সে নদীর জলে হাত দেয়। উবু হয়ে ফিসফিস করে কথা বলে চপলা প্রেমিকার সাথে।
‘তোর সাথে আজ বেশি কথা কওয়া যাবো না। নতুন নাইয়র আছে লগে। সুন্দর মানুষ। তোর মতই সুন্দর। ভরা যৌবন উছলাই পড়ে।’ মাঝি নিজেই লজ্জা পায়। মানুষটারে তার খুব দেখতে মন চায়। আহা একজন মেয়ে মানুষ। গায়ে গতরে মেয়ে মানুষ, তার থেকে একেবারে ভিন্ন শরীরের মানুষ। দেখলেই বুঝা যায়, নরম ভাপা পিঠার মতো শরীরে চঞ্চলা ঝর্ণা।

ভরা নদী। আঁচল খুলে বুক উঁচিয়ে শুয়ে আছে। নদীর বুকে দ্রুত সন্ধ্যা নেমে আসে। মাঝি আশপাশ তাকায়। মিশমিশে কালো আন্ধারে ছেয়ে আছে পৃথিবীর গহ্বর। সেই আন্ধার অস্পষ্ট হতেও সময় লাগে না, চোখ সয়ে নেয় অন্ধকারের জাদু, জাদুর খোলস যে ভাঙতে পারে তার কাছে আলো আঁধার কোনো ব্যাপার না। মাঝি জাদুর খোলস ভাঙতে জানে, আন্ধার হাতিয়ে সে জীবনকে নাচিয়ে বেড়ায়। চারপাশের আধো আলোছায়ায় অলৌকিক শক্তি খেলা করে আজ যেন। কিছু দূরে মনে হয় একটা নৌকা আছে। এতোক্ষণ মাঝি সেটা খেয়াল করেনি। সে অন্য ভুবনে ডুবে ছিলো। মাঝির পরাণে যে সুখের বীণ বাজে তাতে অসংখ্য সাপ নৃত্য করতে করতে ছোবল মারে জাদুর বাক্সে, শয়ে শয়ে জোনাকপোকা তারা হয়ে মিশে যায় আকাশে।

একটু দূরাদূর- পাশাপাশি দুই নৌকো, ছাউনিতে ঢাকা। ছাউনির ভেতর ঘরে রহস্যের মিঠা গন্ধ। সেই গন্ধের উন্মত্ততায় মাথা ঝাঁকিয়ে কাকে যেন মৃদু গলায় শাসন করে মাঝি

একটু দূরাদূর- পাশাপাশি দুই নৌকো, ছাউনিতে ঢাকা। ছাউনির ভেতর ঘরে রহস্যের মিঠা গন্ধ। সেই গন্ধের উন্মত্ততায় মাথা ঝাঁকিয়ে কাকে যেন মৃদু গলায় শাসন করে মাঝি। স্রোত এখন অল্প, বাতাসের বেগ নেই তবুও পাল তোলা। রঙিন পাল এই রাতের অন্ধকারে কতটুকু রঙিন করে দৃশ্য তা বোঝার উপায় নেই। তবুও রঙিন পাল তুলে ঢেউয়ের ঘর্ষণে ঘর্ষণে নৌকা ছুটে চলে। দুটো নৌকাই যেন পাশাপাশি চলছে এক জনম ধরে। প্রতিযোগিতাহীন অদৃশ্য কিছুর মোহে। প্রতিযোগিতার কিছু নেই জেনেও পাড়ের টানে ধীর অথচ কত দ্রুতই না এগিয়ে চলছে তারা। চারদিকের আঁধার যেন টেনে নিচ্ছে সবকিছু নিজের ভেতর রাক্ষসের মতোন।

এক নৌকায় টুকটুকে বউ। হাতভর্তি লাল চুড়ি, পায়ে রাঙা আলতা। আজই বিয়ে হয়েছে, নতুন বউ কারো। রকিব মাঝির বাবা মা নেই। নিজে নিজেই বড় হয়েছে জন্মের পর থেকে। পরিবারের কেউ কোথাও বেঁচে আছে কিনা সে বিষয়ে সে অজ্ঞ। তার কাছে অবশ্য এসবের গুরুত্ব কতটুকু সেটাও উহ্য থাকে বরাবরই। করিম শেখের নৌকায় কাজ শুরু করেছিলো ৫ বছর বয়সে, এটা সেটা ফরমায়েশ খাটতো, আদতে কোনো শিশুকে করিম শেখের প্রয়োজন ছিলো না, নিতান্তই মায়াবশত সে রকিবকে নৌকায় নেয়। সেই করিম শেখও পগার পার হয় কিছু বছর পর। এরপর তার নৌকায় থাকতে থাকতে কাজ শিখে, লগি-বইঠা বাইয়া বাইয়া শরীরে জোর বাড়ায়, এক দুই টাকা করে বাঁশের খুঁপচিতে জমাতে জমাতে একদিন তাগড়া জোয়ান হয়ে যায়। তারপর একটা ভালো দিন দেখে সেই বাঁশ কেটে সারাজীবনের ধনসম্পত্তি বের করে আনে, গুণতে থাকে রাতভোর। স্বপ্ন পূরণের সময় হয়ে আসে, জমানো অর্থ থেকে এই নৌকা কিনে, নদীর তীর ঘেষে এক টুকরো জমি কিনে, নিজ হাতে ঘর তুলে আরও কয়দিন পর। মাঝিপাড়ার অনেক জোয়ান মরদই তার হঠাৎ পরিবর্তনে ঈর্ষান্বিত হয়। এটা সেটা অবান্তর প্রশ্নও চারপাশে ঘুরপাক খায়। যদিও সময়ের ফাঁকফোকরে সেসবও তলায় যায়। ছনের ঘরে রকিব মাঝি তাগড়া হতে থাকে, কেউ খোঁজ নেয় না। আপন মনে নৌকা বায় প্রেমিকার বুকে। একমাত্র গ্রামের মুন্সিই তার একটু খোঁজ খবর রাখেন। অন্যকেউ তাকে এড়িয়ে যায় নাকি সহ্য করতে পারে না তা রবিক মাঝির ভাবনার জগতে আসে না, আসলে তার জগতেও তারা কখনো আসে না। বৈঠার মতো শক্ত পেশিবহুল হাতজোড়া বড়জোর নৌকার গা ধুয়ে মুছে সাফই করতে পারে, কোনো মেয়েমানুষের হাত ধরতে পারে এমন চিন্তা মাঝিপাড়ার কোনো পিতা চিন্তা করতেও পারেনি, কিংবা খেয়ালে খেয়ালে চিন্তায় আসলেও মুহূর্তেই কঠিন মুখের ছায়ায় তা দূর হয়ে গেছে। যেদিন মুন্সি বিয়ের কথাটা তাকে বলে সে কি লজ্জায় না পড়েছিলো! কঠিন তামাটে গাল সন্ধ্যার নরোম সূর্যের মতোন নদীর বুকে ডুবে যায়। সারারাত বউ এর কথা ভেবে চৌকির এপাশ ওপাশ করেই রাত কাটিয়ে দিয়েছে সে, অবশেষে যখন ঘুম এসেছে তখন রাত শেষ হয়ে ভোরের আলো ফোঁটে। সেই মুন্সির তদবিরেই বিয়ের পাকাপাকি কথা হয়ে যায়। কয়েকগ্রাম পরেই মেয়ের বাড়ি, মেয়ে নাকি বড়ই সৌন্দর্যের, কিন্তু ঘরে সৎমায়ের অত্যাচার, মেয়েকে কোনো মতে কারো হাতে তুলে দিতে পারলে বেচারা বাবা একটু শান্তি পায়। তাই ছেলের বাবা মা কই গেলো, গুষ্ঠীর মাথা কে, জাত বংশ, জমিজিরাত কোনো কিছু নিয়েই প্রশ্ন উঠে না।

মাঝে মাঝে রমিছা পাগলী নদীতে আইসা কাপড় খুইলা গোসল করে- তারে, তাও কি দেখা যায় নাকি ন্যাংটা মেয়ে মানুষ। ন্যাংটা মানুষ দেখলে নাকি চোখের জ্যোতি কমে, মুন্সি তারে সাবধান করে দিয়েছে সেই ছোটবেলায়ই


ক্রমেই বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসে, তপড়ানো বুকে মাঝি বিয়ের অপেক্ষা করে। কিন্তু খোদার কি লীলা বিয়ের আগের দিন রাতেই মুন্সির ছোট মেয়ের অসুখ, পাতলা পায়খানা। কলের পানির মতো পানি যাচ্ছে। ছয়মাসের মাইয়ার কাঠির মতোন শরীর সাদা ফ্যানার মতো হয়ে যায়। কিন্তু এর জন্য বিয়ে তো আটকানো যায়না, সব যোগাড়যন্তি হয়ে গেছে। মুন্সি নিজে এসে রকিব মাঝিকে বলে, ‘তুমি বউ নিয়া আসো, নইলে শরমের সীমা থাকবো না।’
নিরুপায় মাঝি তাই একাই চলে বিয়ে করতে। অবশ্য অন্য কাউকে তার আনতেও মনে চায়নি। কি দরকার। সে বিয়া করবে, অন্যদের কি দরকার। এরচেয়ে খেপ নিয়ে যাবে সেখানে, পৌঁছায়ে দিয়ে, বউ নিয়ে রাতে চলে আসবে।কয়েকটা টাকাও আসবে। নতুন মানুষ আসতেছে, খরচ তো আর কম না। তাই একটা সাদা পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি, কিছু চিড়ামুড়ি পুটলাতে বেঁধে সে রওনা হয় মাছের ঝাঁকি সহ দুইজন জেলেকে নিয়ে।

পানিতে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ রাতের নৈঃশব্দের গোমর ছাপিয়ে যায়। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, থইথই জ্যোৎস্নায় নদীর দুকূল ভাসিয়ে নেয়, ঝিলমিল নদীতে গলে পড়া জ্যোৎস্নার দিকে তাকিয়ে মাঝি নরম স্বরে বউকে ডাকে। কোনো সাড়া মেলে না অপরপাশ থেকে। মাঝি শরমের মাথা খেয়ে পুনরায় ডাকে, একটু ভয়ে, কিছুটা আদরে।
‘ও বউ’
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে সেই স্বর কতদূর পৌঁছায় তা মাঝির জানা নেই, হয়তো জলের গভীরে মাছের কানে ছন্দ তুলে। সময় বয়ে যায়, মাঝি বিরস মুখে তাকিয়ে থাকে একমনে, কি দেখে জ্যোৎস্নার গা ছুয়ে তা নতুন বউয়ের জানার কথা নয়। মাঝির ডাকে ঘোমটা উঁচিয়ে সে এতোক্ষণ পুরুষ মানুষটাকে নজরে রাখছিলো, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে গলুই এর ভেতর থেকে বউ বেরিয়ে আসে। আকাশের চাঁদ গলুই ভেদ করে যেন বসে ছিল নৌকায়, থলথলিয়ে জ্যোৎস্না নামে সেই শরীর বেয়ে। মাঝির- পরীর মতো মনে হয়। যদিও সে পরী দেখেনি কখনো, তবুও নৌকায় নৌকায় ফেরি করা পরীর গল্প সে জানে- পরী আসমানের চাঁদের মতোন সুন্দর মেয়ে মানুষ, যে তার নজরে পরে সে পাগল হয়ে যায়। মাঝি তাকিয়ে তাকিয়ে আড়চোখে নয়া বউ দেখে, আস্তে আস্তে বৈঠা ফেলে জলের ভেতর। তার খুব কাছে যেতে মন চায়, মন চায় ছুঁয়ে দেখতে এই মায়ার শরীর, যেই শরীরে জ্যোৎস্না ভর করে সেই শরীর তার নয় এই মেয়ে মানুষের, তার শুধু নৌকার মতোন কিছুটা চকচকে কিছুটা খড়খড়ে হাতুরিপেটা শরীর, পাহাড়ের মতো রুক্ষ কিন্তু সজীব। আকুলিবিকুলি মন কাছে যেতে চায় মানুষটার কিন্তু সে কখনো মেয়ে মানুষ কাছ থেকে দেখেনি। সারাজীবন কলিম শেখের নৌকায় কাজ করছে, দেখেছে শুধু নদীর পানি আর জালভর্তি মাছ, বড়জোর বিয়ের নৌকার বরযাত্রী। আর মাঝে মাঝে রমিছা পাগলী নদীতে আইসা কাপড় খুইলা গোসল করে- তারে, তাও কি দেখা যায় নাকি ন্যাংটা মেয়ে মানুষ। ন্যাংটা মানুষ দেখলে নাকি চোখের জ্যোতি কমে, মুন্সি তারে সাবধান করে দিয়েছে সেই ছোটবেলায়ই।
নদীকে তার প্রেমিকা মনে হয়, সারাজীবন এটাই ভেবে আসছে। আসলে প্রেমিকা শব্দের সঠিক অর্থ অনুধাবনের শক্তি নেই তার, সে শুধু এটুকুই জানে ভালোবাসার মেয়ে মানুষকে প্রেমিকা বলে। তার কাছে ভালোবাসা মানেই এই নদী। নদীর ছোট বড় ঢেউ, মাঝ নদীর ঝড়ের তাণ্ডবকে সে প্রেমিকার রাগী মুখ মনে করেই খুশি। নরম নরম রাগী প্রেমিকা।
তার নতুন বউয়ের হাত ধরতে মন চায়। পরক্ষণেই  মনে পড়ে পাশে আরেকটা নৌকা অল্প দূরেই। জানে না পাশের নৌকায় কে বা কারা। জানে কেউ আছে খুব কাছাকাছি। মাঝি হাঁক দেয়। হাঁকের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যায়।
সাড়া পায় না। শুধু দেখে একটা হারিকেন ঝুলছে টিমটিমিয়ে। আর কোনো সাড়া নেই।

মনে হয় খাইতে বইছে, মাঝি নিজে নিজেই ভাবে। খাওয়ার কথা মাথায় আসায় তার নিজেরও পেটের খিদার কথা মনে হয়। গলুয়ের ভেতরের পুটলায় চিড়া মুড়ি আছে, সবসময়ই নৌকায় রাখে। নদীর নোনামিঠা বাতাসে তার ঘনঘন ভুখ পায়। তখন এক মুঠ চিড়া, আর এক গ্লাস পানি, আর যদি কখনো গুড় থাকে। আহ শান্তি!

ভরা পূর্ণিমা। আকাশ ভাঙা জ্যোৎস্নায় নদীর দুকূল ভেসে যায়, মাঝি চারপাশে চোখ বুলায়, তার গ্রাম আর বেশি দূরে নয়, চার ঘন্টায় পৌঁছে যাবে আশা করে মাঝি। বউ পানিতে রাঙা পা দোলায়, চাঁদের আলোয় ছায়া আর ভেসে যাওয়া লাল রঙ দেখে।
মাঝি বৈঠা নামিয়ে মুগ্ধ চোখে তাকায় সেদিকে। রাজ্যের রূপ নিয়ে কোনো পরী বসে আছে পাশেই, তার বিশ্বাস হয় না। বারবার ঘুরেফিরে তাকায় সেদিকে মুগ্ধ চোখে। নজর না লেগে যায়, তওবা তওবা, বুকে থু দেয় মাঝি, হাত দিয়ে গাল ছোঁয় নিজের খেয়ালেই। তারপর বিরক্ত ভঙ্গিতে বউকে শাসন করে। নয়া বউ। খিলখিল করে হেসে উঠে মাঝির আধোচাপা শাসনের স্বরে।
মাঝি আশপাশ তাকায়। রাইতের বেলা মাইয়া মাইনষের এতো জোরে হাসতে নাই। মাঝি আবার ধমক লাগায়, এইবার সত্যিই সে বিরক্ত, কেমন যেন ভয়ও পায়। বউ ছই এর ভেতর ঢুকে পরে। কেমন ফুঁপিয়ে কাঁদে। সব জ্যোৎস্না শাড়ির আড়ালে ঢেকে সে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকে, ফোঁপায়। মাঝির মায়া হয়। কিন্তু তখনি মনে হয় যা করছে একদম ঠিক, মাইয়া মাইনষের এতো হাসতে নাই, বদনজর লাগবো। আশেপাশে যেমন বদমানুষে ভর্তি তেমনি বদজ্বীনেও ভর্তি। তার গ্রামের এক মেয়েকে বদজ্বীনে ভর করছিলো, সে মেয়ে রাতে এরকম জোরে খিলখিল করে হাসতো।

পাশের নৌকার গতি যেন বেড়েছে, খুব কাছে এখন। মাঝি চিন্তিত হয়। সে আবার হাঁক ছাড়ে। কেডায়… আবার মিলিয়ে যায় সেই ডাক কোনো জবাব আসে না। ধীরে ধীরে  নৌকা ঠিক যেন গায়ের উপর এসে গেছে। মাঝি শঙ্কিত হয়!
আজকাল নদীতে ডাকাইত্যের বহর বয়। নয়া বউ।

Video

Follow Me

Calendar

December 2021
M T W T F S S
« Aug    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031