আর্টস ইতিহাস

চড়ক মেলার আদ্যোপান্ত

অচিন্ত্য অর্ক

বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লোকো উৎসব চড়ক পূজা। চৈত্রের শেষ দিন এ পূজা অনুষ্ঠিত হয় কিন্তু প্রস্তুতি চলে এক মাস আগে থেকে।

‘মেলা’ বাংলাদেশের লৌকিক ও জনপ্রিয় উৎসব। এ দেশে মেলার উৎপত্তি হয়েছে মূলত গ্রাম-সংস্কৃতি থেকে। গবেষকদের মতে, বাংলায় নানান ধর্মীয় কৃত্যানুষ্ঠান ও উৎসবের সূত্র ধরেই মেলার উৎপত্তি। সেদিক দিয়ে এ দেশের মেলার প্রাচীনত্ব হাজার বছরেরও অধিক। এ দেশের প্রাচীন পর্যায়ের উৎসব ও কৃত্যানুষ্ঠানকেন্দ্রিক মেলাগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে জীবন ধারণের আহার্য কৃষিশস্য এবং বিশেষ করে কৃষির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রোদ ও বৃষ্টির কথা।

বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লোকো উৎসব চড়ক পূজা। চৈত্রের শেষ দিন এ পূজা অনুষ্ঠিত হয় কিন্তু প্রস্তুতি চলে এক মাস আগে থেকে। সমাজের উচ্চ স্তরের লোকদের মধ্যে এ অনুষ্ঠানের প্রচলন খুব প্রাচীন নয়। তবে পাশুপত সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রাচীনকালে এ উৎসব প্রচলিত ছিল। ভূমিকেন্দ্রিক সভ্যতার এই দেশে উর্বরতাও প্রার্থনাস্বরূপ এ পূজার উৎপত্তি বলে উল্লেখ আছে। উর্বরতা শুধু জমিতে নয়, ঘরেও। যেজন্য চড়কের গাছ যে আঙ্গিকে পোঁতা হয় তা পুরুষাঙ্গের আকৃতি বলেই ধরা হয়। এ জন্য চড়ক গাছ যেদিন পুকুর থেকে ওঠানো হয় সেদিন যেসব নারীর সন্তান হয় না তাদের ওই পুকুরে স্নান করানো হয় সন্তান হওয়ার প্রত্যাশায়। চড়ক ঘোরার বিষয়টি চান্দ্র মাসের পরিচয় বহন করে।

আদি পুরাণে বর্ণিত আছে, রাজা দক্ষের এক কন্যা ছিল চিত্রা। চিত্রার নামানুসারে এক নক্ষত্রের নাম করা হয় চিত্রা। চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ। তাই হিন্দুধর্মে চৈত্রের আছে বিশেষ স্থান। চৈত্র মাসের শেষ দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বসে বিধাতাকে তুষ্ট করার নানা আয়োজন। এর মধ্যে সবচেয়ে অভিনব ও প্রাচীন আয়োজন চড়ক পূজা, সেই সঙ্গে মেলা। চড়ক পূজার ১০-১২ দিন আগে থেকে বিভিন্ন এলাকার পূজারিদের মধ্যে ৪০-৫০ জন সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষিত হয়ে গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিব-গৌরীসহ নৃত্যগীত করে মাগন করেন। চড়ক পূজা পর্যন্ত তারা পবিত্রতার সঙ্গে সন্ন্যাসব্রত পালন করে ও আমিষ খাদ্য গ্রহণ করে না। সারাদিন উপবাস পালন করে। চড়ক পূজার ২ দিন আগে থেকে পূজারিরা শ্মশানে গিয়ে পূজা-অর্চনা করে ও শেষে গৌরীর বিয়ে, গৌরী নাচ ও বিভিন্ন গান গেয়ে ঢাকের বাজনায় সরগরম করে গোটা এলাকা প্রদক্ষিণ করে।

চৈত্র মাসের শেষ দিন পূজারিরা পূজা করে পান বাটা দিয়ে চড়ক গাছকে নিমন্ত্রণ জানায়। অর্থাৎ দিঘি বা পুকুর থেকে চড়কগাছ তুলে আনা হয়। তারপর মাঠে গাছ পুঁতে দেওয়া হয়। গাছের চূড়া থেকে প্রায় কোমর পর্যন্ত আড়াআড়ি চারটি পাখার মতো করে বাঁধা হয় চারটি মোটা বাঁশ এবং তাতে যুক্ত করা হয় মোটা-লম্বা রশি। এ সময় শিব ও কালীর নৃত্য দেখানো হয়। নৃত্য শেষে ওই পুকুর বা দিঘিতে স্নান করে সন্ন্যাসীদের জিহ্বা ও নাকে গহনা গেঁথে দেওয়া হয়। নৃত্যের তালে তালে চড়কগাছ ঘোরানো হয়। দেবতার পূজা-অর্চনা শেষে অপরাহ্নে মূল সন্ন্যাসী চারজনের (কখনো এক বা দুই) পিঠে লোহার দুটি বড়শি গেঁথে রশিতে বেঁধে চড়ক গাছে ঝুলিয়ে ঘোরানো হয়।

তবে চড়ক পুজার এসব অনুষঙ্গকে কেন্দ্র করে বঙ্গের রাজা-জমিদাররা তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতো। তারা সংক্রান্তির দিনে, ঋণে জর্জরিত চাষিদের বড়শিতে গেঁথে ঘোরাতেন চড়কের গাছে। সম্প্রতি একটি লেখায় এমনি অত্যাচারের কথা ইঙ্গিত দিয়েছেন লেখক সম্পর্ক মণ্ডল। তিনি উল্লেখ করেছেন, পূর্ববঙ্গের চৈত্র মাসের নিয়ম কানুন ছিল কিছুটা আলাদা। এখানে জমিদাররা প্রজাদের খাজনা জমা দেওয়ার শেষ দিন স্থির করেছিলেন ৩০ চৈত্র। মরা মাসে এমনিতেই মানুষের হাতে টাকা পয়সা কম থাকত। তার উপর ফি-বছর খরা, বন্যা আর ঘূর্ণিঝড়। খাজনা দেওয়ার জ্বালায় বহু প্রান্তিক চাষী বাধ্য হত আত্মহত্যা করতেও। এটা ছিল জমিদার-মহাজন ও ব্যবসায়ী সম্মিলিত ফাঁদ, যেখানে প্রতিটি মানুষ পা দিতে বাধ্য হতো। অভাবের তাড়নায় হোক বা নিত্যপ্রয়োজনে, দায়ে পড়ে এই তিন শ্রেণির কাছে যেত এবং সর্বস্ব খুইয়ে ঘরে ফিরত তারা। প্রয়োজনে মহাজনরা পাইক পাঠিয়ে আদায় করতেন তাদের সমস্ত সুদ-আসল।

লেখক আখতার উল আলম তার ‘নববর্ষ ও বাংলার লোক সংস্কৃতি’ বইটিতেও এ ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি পূর্ববঙ্গের গ্রামে গ্রামে পেয়েছিলেন এই নিষ্ঠুরতার বর্ণনাগুলো। কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, বরিশালের জমিদাররা তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন। যদিও চড়ক সংক্রান্তিতে বড়শি ফোঁড়া বা বাণ ফোঁড়া ছিল প্রথমে অপেক্ষাকৃত নীচ সম্প্রদায়ের প্রথা। ব্রাহ্মণরা অংশগ্রহণ করতেন না। কিন্তু খাজনা আদায় করতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পাশ হওয়ার জমিদাররা এই প্রথার বাজেভাবে ব্যবহার করেন। ১৮০০ সাল থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় এটা চলেছিল। এর মধ্যে ১৮৬৫ সালে ইংরেজরা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল নিষ্ঠুরতা দেখে (বাণ ফোঁড়া, বড়শি ফোঁড়া ইত্যাদি)।
যদিও বাংলাতে এটা শুরু হয়েছিল ১৪৮৫ সালে, রাজা সুন্দরানন্দ ঠাকুরের আমলে। তখন তাদের রাজপরিবারেই এটা পালন করা হতো। পরে তা ছড়িয়ে যায় বঙ্গের সমস্ত প্রদেশে।

Tags

Video

Follow Me

Calendar

March 2021
M T W T F S S
« Jan    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031