অষ্ট-ব্যঞ্জণ ইতিহাস

হাজার গুণে গুণান্বিত হাজারি গুড়

হাজারি গুড়; ছবি: কল রেডি

জুন সামুরাই

মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়ের নাম শুনেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এ গুড়ের গুণাগুণ দেশ ছাড়িয়ে বিদেশ বিভূঁই পর্যন্ত। এমনকি রানী প্রথম এলিজাবেথ স্বয়ং এর সুনাম ছড়িয়েছেন। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় হাজারি গুড় কিভাবে ঐতিহ্যবাহী হয়ে উঠল, তারই সাতকাহন।

হাজারি গুড়ের উপকথা ও নামকরণ

হাজারি গুড় image source: tripzone

মিষ্টি গন্ধ ও মনোহর স্বাদের হাজারি গুড় নিয়ে প্রচলিত আছে নানারকমের উপকথা। প্রায় দুইশ বছর আগে মানিকগঞ্জের ঝিটকা অঞ্চলে হাজারি প্রামাণিক নামে একজন গাছি ছিলেন যিনি খেজুরের রস দিয়ে গুড় তৈরি করতেন। একদিন বিকালে খেজুরগাছ কেটে হাঁড়ি বসিয়ে গাছ থেকে নামামাত্রই একজন দরবেশ এসে তার কাছে রস খেতে চান। তখন ওই গাছি দরবেশকে বলেন, সবে গাছে হাঁড়ি বসানো হয়েছে। এ অল্প সময়ে বড়জোর ১০ থেকে ১৫ ফোঁটা রস হাঁড়িতে পড়েছে। তবুও দরবেশ রস খাওয়ার আকুতি জানান এবং তাকে গাছে উঠে হাড়ি নামাতে বলেন।  
গাছি তখন খেজুর গাছে উঠে হতবাক হয়ে যান। দেখতে পান, মাত্র কয়েক মিনিটে পুরো হাঁড়ি রসে ভরে গেছে। গাছি হাঁড়িভরা রস নিয়ে নিচে নেমে দরবেশকে রস খাওয়ান এবং তার পা জড়িয়ে ধরেন। তখন দরবেশ গাছিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘কাল থেকে তুই যে গুড় তৈরি করবি তা সবাই খাবে এবং তোর গুড়ের সুনাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়বে।’ বলেই দরবেশ দ্রুত চলে যান। ওই দিন থেকেই হাজারি প্রামাণিকের নামেই এ গুড়ের ‘হাজারি’ নামকরণ হয়। 
আবার প্রবীণ অনেকের মতে, গাছের রস থেকে বিশেষ কৌশলে সুগন্ধময় সফেদ এ গুড়ের উদ্ভাবন করেছিলেন হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা গ্রামের মিনহাজ উদ্দিন হাজারি। প্রকৃত হাজারি গুড় তৈরির গোপন কৌশল একমাত্র তার পরিবারের সদস্যদের মাঝেই রয়ে গেছে। তার নামেই এই গুড়ের নামকরণ  হয়েছে ‘হাজারি গুড়’। 

রানী এলিজাবেথ ও হাজারি গুড়

হাজারি পরিবারের দাবি, ব্রিটিশ আমলে রানী প্রথম এলিজাবেথের ভারতবর্ষ সফরের সময় এই গুড় তাকে খেতে দেয়া হয়। তিনি গুড় হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে চাপ দেয়া মাত্রই তা ভেঙে হাজারটি গুড়া হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে রানী গুড়ের সুবাসে মুগ্ধ হয়ে মুখে নিয়ে খেয়ে দেখেন। এরপর থেকেই এই গুড়ের নাম হাজারি গুড়। বাংলার লোকমুখে আরো প্রচলিত রয়েছে, রানী এই গুঁড়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন। সেইসঙ্গে বাংলায় হাজারি লিখিত একটি সিল উপহার দেন। যা দিয়ে গুড়ের গায়ে এখনো সিল দেয়া হয়। 

রানী এলিজাবেথ Image source: back in the day of

ভারতবর্ষে তখন সম্রাট আকবরের স্বর্ণযুগ। ওদিকে ইউরোপ জুড়ে রানী প্রথম এলিজাবেথের বিকাশপর্ব। মনোহর আবহাওয়া ও নান্দনিক প্রকৃতির জন্য মুঘল সাম্রাজ্যের ‘জান্নাতাবাদ’ খ্যাত এই বঙ্গভূমির সুনাম তখন আটলান্টিকের ওপারেও বিস্তৃত। অন্তত চারশ’ বছর আগের কথা। শত বছরের জনশ্রুতি মতে, মানিকগঞ্জ অঞ্চলের গুড়ের ঘ্রাণ ও স্বাদে মুগ্ধ হয়েছিলেন রানী। গুণমুগ্ধতা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি নিজেই ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এ গুড়ের নাম।

রানীর উপহারকৃত হাজারি লিখিত সিল। যা দিয়ে গুড়ের গায়ে সিল দেয়া হয়।  image source: prothom alo

হাজারি গুড়ের রহস্য

ভোরের আজানের ধ্বনি কানে ভেসে আসার আগেই ঘুম ভেঙে যায় সেখানকার গাছি এবং তাদের গৃহিণীদের। গাছিরা চলে যায় খেজুর গাছ থেকে হাড়ি ভর্তি রস আনতে। আর গৃহিণীরা রস জাল করার জন্য প্রস্তুতি নিতে চুলার পাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জনশ্রুতি রয়েছে, গাছি ও গৃহিণীদের এই গুড় তৈরি ও বিক্রির ব্যস্ততা অন্তত দেড়শ’ বছরের।

গাছ থেকে খেজুর রস সংগ্রহ করছেন গাছি Image source: dhaka tribune

স্থানীয়দের মতে, গাছির রস নামানো থেকে শুরু করে গুড় তৈরির মধ্যে রয়েছে আদি এক প্রক্রিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও হাজারি গুড় তৈরির এই প্রক্রিয়ার কোনো পরিবর্তন হয়নি। ভালো গুড়ের জন্য দরকার খুব ঠাণ্ডা রোদ, ঝলমলে আবহাওয়া। হাঁড়িগুলো গরম পানিতে ধুয়ে রোদে শুকাতে হয়। কাক ডাকা ভোরেই গাছে উঠে রস নামাতে হয়। মিষ্টি ও টলটলে রস ছাড়া এ গুড় হয় না।  সকাল আটটার মধ্যে গুড় বানানো শেষ করতে হয়।

গুড় তৈড়ির প্রক্রিয়া Image source: channel i online

বেশি শীত অর্থাৎ ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এই গুড় উৎপাদনের উপযুক্ত সময়। আগের দিন বিকালে গাছ কেটে হাঁড়ি বেঁধে দেয়া হয়। পরদিন ভোরে গাছ থেকে রস নামিয়ে ছেঁকে ময়লা পরিষ্কার করে মাটির তৈরি জালা অথবা টিনের তৈরি পাত্র চুলায় জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করতে হয়। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় কাশের খড়ি। 

মানিকগঞ্জে গুড়ের বাজারে খেজুর গুড়ের বিশাল পসরা বসলেও হাজারি গুড় সেখানে অনন্য। তাই এর দাম প্রচলিত পাটালি গুড়ের তুলনায় পাঁচ থেকে দশগুণ। এ অঞ্চলের প্রায় শ’খানেক পরিবার হাজারি গুড়ের ওপর  নির্ভর করে তাদের জীবিকা চালিয়ে আসছে। 

Video

Follow Me

Calendar

March 2021
M T W T F S S
« Jan    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031