আর্টস পর্যবেক্ষণ

‘খোদা কে লিয়ে’ দুঃসাহসী উর্দু সিনেমা

source: bitlanders

মোস্তাক খান

পাকিস্তানের মত দেশে ‘খোদা কে লিয়ে’ সিনেমা তৈরি হয় এবং প্রচারও হয়! আমাদের দেশে এই সিনেমাটি তৈরি হলে দেশ অচল করে দেবার হুমকি দেয়া হতো

একসময়ে বাংলাদেশে উর্দু সিনেমার জনপ্রিয়তা ছিলো। উর্দু  সিনেমায় কাজও করতেন বাংলাদেশের বাঘা বাঘা শিল্পী-কলাকৌশলীরা। দুটো ভূখণ্ড এক দেশ হওয়ায় এবং ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার কারণে দুই দেশের বাসিন্দাদের ভেতর আত্মিক টান ছিলো। কিন্তু সে টান শাষণ, শোষণ, নির্যাতনের কাছে হার মেনেছে। দেশ আলাদা হওয়ার পর ও পূর্বসূত্রে পাকিস্তানকে এখনও আমাদের দেশের অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা পবিত্রস্থান মনে করে। পাকিস্তানীরাও তাই মনে করে। সেই পাকিস্তানের মত দেশে ‘খোদা কে লিয়ে’র মত সিনেমা তৈরি হয় এবং প্রচারও হয়! সিনেমাটি দেখার পর এ ভাবনাটা কাজ করেছিল কিছুদিন। আমাদের দেশে এই ছবিটি তৈরি হলে দেশ অচল করে দেবার হুমকি দেয়া হতো। এমনকি পুনরায় একটি ‘শাপলা চত্বর’রের ঘটনা ঘটানো অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। ব্যক্তিগত ভাবে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নিয়ে নির্মিত খুব কম সিনেমা দেখা হয়েছে। তবু সম্প্রতি আমার দেখা এ সিনেমটি মনোযোগ কেড়েছে। সে সাহস নিয়েই লিখতে বসলাম। যদিও কোন সিনেমা নিয়ে রিভিউ লেখার মত বোদ্ধা আমি নই, তবুও যা বুঝতে পেরেছি তা বলার চেষ্টা করেছি।

সিনেমার পোস্টার image source: pakistani.pk

‘খোদা কে লিয়ে’ সিনেমাটির পরিচালক শোয়ায়েব মানসুর। স্ক্রিপ্ট লেখা, প্রযোজনা এবং পরিচালনা সবই করেছেন সোয়ায়েব মনসুর নিজেই। এমনকি তিনি এই সিনেমার গান পর্যন্ত লিখেছেন! বলতে গেলে তিনি নিজ হাতে পরম মমতায় সিনেমাটি তৈরি করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন নির্মাতা হিসেবে তিনি কতটা মেধাবী। এছাড়া সিনেমাটির সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন সোহাইল হায়াত। সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৫ লক্ষ ডলারের বেশি আয় করে। পাকিস্তান, ভারত এবং আমেরিকায় মুক্তি দেয়া হয়।
ভারত-পাকিস্তান দু’টি চির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। যে কোনো রাজনৈতিক ইস্যুতে যদি দ্বন্দ্ব বাঁধে তার প্রভাব পড়ে দুই দেশের সিনেমার উপরে। সম্প্রতি কাশ্মির ইস্যুতে আবার দুই দেশের সিনেমা আদান-প্রদান এমন কি দুই দেশের টিভি সম্প্রচার পর্যন্ত বন্ধ করা হয়! ‘খোদা কে লিয়ে’ তেমনই একটি শক্তিশালী সিনেমা যা দুই দেশের ৪৩ বছরের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে মূখ্য ভূমিকা রেখেছিল।

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কারনে দুই দেশের চলচ্চিত্র বিনিময় নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তার ৪৩ বছর পর ২০০৮ সালের এপ্রিলের ৪ তারিখে ভারতে পাকিন্তানের সিনেমা প্রদর্শিত হয় এবং তা এই ‘খোদা কে লিয়ে’ দিয়েই। কিন্তু দুই দেশ এই শর্তে রাজি হয় যে, ভারতে পাকিস্তানী সিনেমা মুক্তি পাবে উর্দূ ভাষায় আর পাকিস্তানে ভারতীয় সিনেমা মুক্তি পাবে হিন্দি ভাষায়। ভারতে পাকিস্তানী সিনেমা বন্ধ হলে পাকিস্তানই বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কারন পাকিস্তানের সিনেমার বাজার খুবই ছোট। দিনে দিনে পাকিস্তানের সিনেমা হলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে। যাই হোক, ভারতে এই সিনেমাটি তখন ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরবর্তীতে সিনেমাটি বিশ্বের সিনেমা বোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এবং অনেক এ্যাওয়ার্ড তার ঝুলিতে যুক্ত হয়।

পরিচালক শোয়ায়েব মানসুর image source: twitter

এতে অভিনয় করেছেন- শান(মানসুর), ফাওয়াদ খান(শারমাদ), ইমান আলী(মারিয়াম/মেরি), নাঈম তাহির(মানসুর এবং শামরাদের বাবা), রশিদ নাজ(মাওলানা তাহিরি), হামিদ শেখ(শের শাহ), হুমায়ুন কাজমি(মেরির বাবা), অস্টিন মেরি সেরি(জেনি), সিমি রাহিল(মানসুর শারমাদের মা) এবং একটি বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা নাসিরউদ্দিন শাহ্।
ছবিটির গল্প এগিয়েছে দুই ভাই মানসুর ও শারমাদকে নিয়ে। তারা পাকিস্তানের জনপ্রিয় কণ্ঠ শিল্পী। দুই ভাই এক সাথেই গান গায়। হঠাৎ করে শারমাদ এক মসজিদের ইমাম তাহিরীর প্ররোচনায় মারাত্মক রকমের ধার্মিক হয়ে পড়ে। গানকে হারাম বলে গান ত্যাগ করে। ‘গান হারাম’ এটি ভুল ধারণা, মানসুর তার ভাই শারমাদকে কোনোভাবে তা বুঝাতে সক্ষম হয়নি। শারমাদ আরাম আয়েশের জীবন ত্যাগ করে পাকিস্তান এবং আফগানীস্তানের সীমান্তরের কাছাকাছি মরুভূমিতে গুলবাজ খানের বাড়িতে থেকে শের শাহের সাথে বসবাস শুরু করে এবং জঙ্গিবাদের তালিম নিতে থাকে। কিন্তু শারমাদের কোমল মন জীবন নিয়ে খেলায় সায় দেয় না। সে মানুষ মারতে রাজি হয় না কিন্তু শের শাহ্ তাকে দিয়ে জোর করে এসব করানোর চেষ্টা করে।

ওদিকে শারমাদের চাচা লন্ডনে এক ব্রিটিশ নারীকে বিয়ে করে সেখানে বসবাস করেন। তাদের একমাত্র কন্যাসন্তান মেরি। মেরি একজন শিক্ষিত, আধুনিক এবং স্বাধীনচেতা নারী। সে এক ব্রিটিশ ছেলেকে পছন্দ করে। কিন্তু তার বাবা তাতে রাজি থাকেন না। তিনি চান না মেয়ে কোন ব্রিটিশ ছেলেকে বিয়ে করুক। তাই সে তার মেয়েকে নিয়ে পাকিস্তানে বেড়াতে আসেন এবং জোর করে তার ভাতিজা নব্য জঙ্গি শারমাদের সাথে বিয়ে দিয়ে চলে যান।
অন্যদিকে মানসুর সঙ্গীতে উচ্চতর ডিগ্রীর জন্য শিকাগোতে একটি মিউজিক স্কুলে ভর্তি হয়। সেখানে তার এক সহপাঠী জেনিকে পছন্দ করে বিয়ে করে। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ারে তালেবানদের হামলার জের ধরে মানসুরের ইসলামিক ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে FBI (Federal Bureau of Investigation) কর্তৃক আটক হয়। সেখানে তাকে আটকে রেখে প্রচণ্ড নির্যাতন করা হয়। কিন্তু কোন তথ্য না পেয়ে জেনিকে ছাড়াই তাকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তারপর মানসুর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।

বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করেন নাসির উদ্দিন শাহ্ image source: pakistani.pk

পরিচালক দেখিয়েছেন কিভাবে ধর্মকে ব্যবহার করছে উগ্র মৌলবাদীরা এবং কিভাবে জিহাদের নাম করে নিরীহ মানুষও অহেতুক শাস্তির সম্মুখীন হচ্ছে

এদিকে মেরিকে জঙ্গিদের আস্তানায় বন্দি করে রাখা হয়। একবার সেখান থেকে পালাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। তার জীবন থেকে সকল প্রকারের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়। এবং সেখানে সে একটি বাচ্চার জন্মও দেয়। তবে কৌশলে মেরি একটি চিঠি লন্ডনে পাঠাতে সক্ষম হয়। মেরির মা এবং মেরির ব্রিটিশ প্রেমিক ব্রিটিশ সরকারের ফোর্স নিয়ে শারমাদের বাবাকে দিয়ে মেরিকে কড়া নিরাপত্তায় উদ্ধার করে। এদিকে মেরি তাকে জোর করে বিয়ে দেবার কারনে কোর্টে বিচারের আবেদন করে সেখানে মাওলানা ওয়ালি (নাসির উদ্দিন শাহ্) ব্যাখ্যা করেন কিভাবে ধর্মের নামে বিশ্বে জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। কিভাবে ধর্মের নামে ব্যবসা করা হচ্ছে। তিনি ব্যখ্যা করেন– ধর্মে নারী স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়নি বরং বৃদ্ধি করেছে। উপযুক্ত নারীকে জোর করে বিয়ে দেয়াও ধর্ম সমর্থন করে না।

হাদিস কোরানের রেফারেন্স দিয়ে তিনি প্রমাণ করেন জোর করে বিয়ে দেয়া বেআইনি। তাছাড়া তরুণ ও ধর্মপ্রাণদের মাঝে জঙ্গিবাদের উস্কানি ছড়িয়ে দেয়াও ইসলাম ধর্ম কখনই সমর্থন করে না। বাইরের বেশ-ভুষা ধর্মের পরিচয় নয়, ধর্মের পরিচয় অন্তরে। কেউ ধর্মের বেশ-ভুষা পরে জঘন্য কাজ করছে আবার কেউ এসব বেশ-ভুষাহীন হয়েও নৈতিক জীবন-যাপন করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে মাওলানা ওয়ালি বলেন, ‘দীন মে দাড়ি হে; দাড়ি মে দীন নেহি হে’। তিনি আরো বলেন- বাইরের থেকে ভেতর শুদ্ধ করাই আমাদের আসল কাজ। নাসির উদ্দিন শাহ্ সিনেমার শেষ দৃশ্যের এই ছোট একটা চরিত্রে অভিনয় করলেও সেখানে চালকের আসনে বসে স্টিয়ারিং ধরেন।
অবশেষে শামরাদ, মানসুর, মেরির কি হয়? কোথায় তাদের  ভবিষ্যৎ? সেটুকুর জন্য হলেও আপনার সিনেমাটা দেখা উচিত। 

শান শাহিদ (মানসুর) ও অস্টিন মেরি সেরি(জেনি) image source: imdb

পরিচালক চমৎকার ভাবে একই সাথে এতগুলো গল্পকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়েছেন সমান তালে। এখানে পরিচালক খুব দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে ধর্মকে ব্যবহার করছে উগ্র মৌলবাদীরা এবং কিভাবে জিহাদের নাম করে নিরীহ মানুষও অহেতুক শাস্তির সম্মুখীন হচ্ছে। একদিকে কিছু উগ্র ধার্মিকরা ধর্মকে ব্যবহার করে বিশ্বে জঙ্গিবাদকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাছাড়া সাম্রাজ্যবাদীদের অমানবিক আচরণকেও কৌশলে বলার চেষ্টা করেছেন পরিচালক।

বলা যায় বর্তমান বিশ্বের জন্য সিনেমাটি খুবই প্রাসঙ্গিক। এই ধরণের সিনেমা তৈরি হওয়া জরুরি। এমন সিনেমা তৈরি করতে একজন পরিচালককে অনেক বাঁধা বিপত্তি পার হতে হয়। ২০১০-এ আমাদের দেশীয় পরিচালক তারেক মাসুদ এর কাছাকাছি প্লটে নির্মান করেছিলেন ‘রানওয়ে’। বলা চলে ছবিটি বাংলাদেশে সেভাবে প্রচার প্রচারণা পায়নি। যারা মানসম্মত সিনেমা দেখতে চান তাদের জন্য ‘খোদা কে লিয়ে’ সিনমাটি উপযুক্ত সমাধান।

Video

Follow Me

Calendar

October 2020
M T W T F S S
« Jun    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031