জিওগ্রাফি জীবজগৎ ট্রাভেল

ইন্সটিটিউটো টেরা: মানুষের তৈরি মরুদ্যানের গল্প

ইন্সটিটিউটো টেরা

লুফাইয়্যা শাম্মী

মরু-প্রায় রুক্ষ ভূমিতে বিশাল বন বা উদ্যান তৈরি করে অসম্ভব স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন ব্রাজিলের এক দম্পতি। যেখানে রয়েছে পাহাড়, জলাভূমি, ঝর্ণা এমনকি বিলুপ্তপ্রায় প্রাণিও!

শুরুর গল্প

ব্রাজিলিয়ান দম্পতি সেবাস্তিও সালগাদোর এবং ললিয়া দেলুইজ ওয়ানিক দু’জনই প্রকৃতিপ্রেমী। সেবাস্তিও সালগাদোর মূলত ফটোগ্রাফার ছিলেন। ১৯৯৪ সালে সালগাদোর রুয়ান্ডার গণহত্যার নির্মম দৃশ্য তার ক্যামেরায় তোলেন। কিন্তু গণহত্যার করুণ দৃশ্যের ভিতর থেকে দেশে ফিরে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন তিনি।

সেবাস্তিও সালগাদোর পরিবারিক সূত্রে গবাদি পশুর একটি বাতিল খামার পেয়েছিলেন। যেটি ব্রাজিলের মিনাস গেরেইস রাজ্যের আইমোরিস শহরের কাছে। তবে যেখানকার প্রকৃতি হয়ে উঠেছিল বসবাস অযোগ্য রুক্ষ মরু অঞ্চল।

সেবাস্তিও সালগাদোর এবং ললিয়া দেলুইজ ওয়ানিক source: institutoterra.org

পরবর্তীতে সালগাদোর চেয়েছিলেন অঞ্চলটি প্রাণবন্ত হোক। দুর্ভাগ্যক্রমে, এই অঞ্চলের কঠিন রূপান্তরের কারণে মাত্র ০.৫% গাছ-পালায় আচ্ছাদিত ছিল এবং সব ধরনের বন্যজীবন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার স্ত্রী লেলিয়ার মনে হচ্ছিলো যে তাদের পুনরায় বন প্রতিস্থাপন করা উচিত। পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি এই সম্পত্তিটিকে তারা উপ-উষ্ণমন্ডলীয় রেইন ফরেস্টের প্রাকৃতিক অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব এই কারণটিকে সমর্থন করার জন্য, এই দম্পতি ১৯৯৮ সালে ইনস্টিটিউটো টেরা স্থাপন করেছিলেন, যার স্লোগান ছিল ‘দোস নদীর উপত্যকার টেকসই উন্নয়নের জন্য নিবেদিত পরিবেশ সংস্থা’। ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে প্রথম বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম শুরু করেন এ দম্পতি। তাদের পাশে ছিলেন স্থানীয় শিক্ষার্থীরা। যারা দিন-রাত পরিশ্রম করে বর্তমানে এই জমিটি অনুর্বর প্লট থেকে ক্রান্তীয় স্বর্গে পরিণত করেছেন। এরপর ‘ইন্সটিটিউটো টেরা’র আওতায় এ দম্পতি গঠন করেন ‘ফাজেন্দা বুলসিও’ নামে প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের এনজিও প্রতিষ্ঠান।

source: institutoterra.org

ইন্সটিটিউটো টেরা

বিশ্বব্যাপী প্রকৃতি-প্রেমীদের কাছে আলোচিত এই ‘ইন্সটিটিউটো টেরা’র কার্যক্রম নানাদিকে বিস্তৃত। এর প্রধান উদ্দেশ্য জীব-বৈচিত্র্যের রক্ষণাবেক্ষণ, রিও ডস উপত্যকার সংরক্ষণ, ঐতিহ্যবাহী-গ্রামীণ সম্প্রদায়ের রক্ষণাবেক্ষণ এবং তাদের বিকাশে ভূমিকা।

ভাবছেন এত বড় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক যোগান কোথায় থেকে আসে? মজার ব্যাপার হলো ‘ইন্সটিটিউটো টেরা’ গঠনের পর থেকে এখন পর্যন্ত আর্থিক সংকটে ভুগতে হয়নি। কারণ ব্রাজিলের সরকারি ও বেসরকারি খাতসহ অসংখ্য বিদেশি সংস্থার আর্থিক সহায়তা আসে এ প্রতিষ্ঠানে। কখনো যদি শখ করে দর্শনার্থী হয়ে এ উদ্যানে আসেন তবে আপনার প্রবেশ একদম ফ্রি!

source: institutoterra.org

ইন্সটিটিউটো টেরার রয়েছে নিজস্ব বীজ গবেষণাগার। যেখানে গবেষণার পাশাপাশি বীজ থেকে আটলান্টিক বনের জন্য চারাও উৎপাদন করা হয়। টেরার এ গবেষণাগারটি ওই অঞ্চলের স্থানীয় প্রজাতির মিলিয়নেরও বেশি চারা তৈরি করেছে। ব্রাজিলিয়ান এ দম্পতি পুরো অঞ্চলটি বনায়নে ইতোমধ্যে দুই মিলিয়নেরও বেশি গাছ লাগিয়েছেন। এছাড়া কৃত্রিম এই বনটিতে রয়েছে আটলান্টিক বনাঞ্চলের ২৯৩ প্রজাতির গাছ। এ বিশাল বনভূমি সৃষ্টির পর নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এখানে আসতে শুরু করে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণিরাও। যেসব প্রাণি পৃথিবীর কোথাও নেই, এমনকি অ্যামাজনের রাজ্য ব্রাজিলেও সংকটাপন্ন, সেসব প্রাণিও আছে এ টেরায়।

তথ্য মতে, এই বনাঞ্চলে ১২২ প্রজাতির পাখি (এদের মধ্যে ৬টি বিলুপ্তপ্রায়), ৩৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণি (এরমধ্যে ২টি পৃথিবীতে বিপন্ন এবং ৩টি ব্রাজিলে বিপন্ন), ১৫ প্রজাতির উভচর এবং ১৫ প্রজাতির সরীসৃপ সনাক্ত করা হয়েছে। এখানে প্রাণিদের খাদ্য সংকট, বিভিন্ন পশুপাখির বৃদ্ধি, স্থানীয় জীব-বৈচিত্র্য রক্ষার কথা ভেবে এখানে বিভিন্ন উপকারী উদ্ভিদের (ফলমূল, ঔষধি) চারা রোপণ করা শুরু করেন তারা। এমনকি মৃতপ্রায় ঝর্ণাগুলোতেও পুনরায় প্রাণ ফিরিয়ে নিয়ে আসে ইন্সটিটিউটো টেরা। ২০১০ সালে ওলহোস ডিগুগুয়া প্রোগ্রাম (Eyes of Water Program) এর মাধ্যমে এ উদ্যোগ চালানো হয়।

source: institutoterra.org

ইন্সটিটিউটো টেরা নির্দিষ্ট অঞ্চলে কাজ করে তা কিন্তু নয়। ব্রাজিলিয়ান দম্পতি এ প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে গেছেন স্থান, কাল, পাত্রের ঊর্ধ্বে। এ টেরা কাজ করছে পুরো আটলান্টিক অঞ্চলের রুক্ষ জমিতে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে। ২০০৫ সাল থেকে এখানে ১৯২ জন প্রযুক্তিবিদ রয়েছেন, যারা পল্লী উন্নয়নের এজেন্ট হিসাবে কাজ করেন।

ইন্সটিটিউটো টেরার অন্যান্য উদ্যোগ

শুধু যে নিজেদের কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকে প্রতিষ্ঠানটি তা কিন্তু নয়। এখান থেকে নেওয়া যায় বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ। এই যেমন ‘ফজেন্দা বুলসিও’র আওতায় এক বছরের ফ্রি কোর্স রয়েছে। যেখানে ‘সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন ইকো-সিস্টেম রিস্টোরেশন (এনইআরই)’ নামে কোর্স করানো হয়। এমনকি টেরার বিভিন্ন গবেষণালব্ধ ফলাফল ও চারা তৈরির কৌশল সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে পোর্টালে www.portalsemear.org দেওয়া আছে। বর্তমানে পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রতিরক্ষা ও রিও ডসের বিভিন্ন গোত্রের রক্ষণাবেক্ষণ করা ইন্সটিটিউটো টেরার কাজের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

অবক্ষয়ের এই পর্যায়ে একটি বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা সহজ কাজ নয়, তবে ইন্সটিটিউটো টেরা ভালোবেসে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।

Video

Follow Me

Calendar

October 2021
M T W T F S S
« Aug    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031