লাইফস্টাইল

আরামদায়ক পোষাক লুঙ্গির ইতিবৃত্ত

আকাশচন্দ্র শীল

আমরা সবাই কমবেশি লুঙ্গি পরিধান করি অথচ লুঙ্গি কিভাবে আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেল তা অজ্ঞাত আমাদের অনেকের কাছেই। সেসবের ইতিহাস নিয়েই ‘লুঙ্গির ইতিবৃত্ত’

অতি আরামদায়ক ও ঐতিহ্যবাহী পোষাক লুঙ্গি। শুধু বাংলাদেশই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনেকের অত্যন্ত প্রিয় পোষাক হিসেবে এটি সুপরিচিত ও জনপ্রিয়। কিছু কিছু অঞ্চলে এই লুঙ্গি খানদানের পরিচায়কও বটে। দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড ও বিয়েসহ নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বহুল ব্যবহৃত হয়ে থাকে এটি। ভিন্ন ভিন্ন আদ্রতায় স্বস্তিদায়কের জন্য এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। লুঙ্গি পড়ার ক্ষেত্রে দুই গেড়ো বাঁধন খুবই জনপ্রিয়। এ পদ্ধতিতে লুঙ্গি খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আমরা সবাই কমবেশি লুঙ্গি পরিধান করি অথচ লুঙ্গি কিভাবে আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেল তা অজ্ঞাত আমাদের অনেকের কাছেই। সেসবের ইতিহাস নিয়েই ‘লুঙ্গির ইতিবৃত্ত’।

লুঙ্গি মূলত বার্মিজ শব্দ। সাধারণত ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমারসহ এশিয়ার বেশ কিছু দেশে লুঙ্গি জনপ্রিয় পোশাক। জানা যায়, দক্ষিণ ভারতের তামিল নাডুতে এর সূচনা ঘটে।

বার্মিজ ঐতিহাসিক লুঙ্গি


তামিল নাডুর ‘ভেস্তি’ নামক পোশাককে লুঙ্গির পূর্বসূরি হিসেবে অভিহিত করা হয়। সেসময় মসলিন কাপড়ের ‘ভেস্তি’ তামিল নাডু থেকে ব্যবিলনে রপ্তানি করা হতো।বারাদাভারগাল নামের জেলে সম্প্রদায় মিশর ও মেসপটেমিয়া অঞ্চলে লুঙ্গি রপ্তানিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব রাখেন।

সাদা এক রংয়ের কাপড়ই সাধারনত লুঙ্গি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখনও ভারতে এর প্রচলন রয়েছে। কালক্রমে ফুল, পাতাসহ নানা রঙের ছবির ছাপ যোগ করা হয় লুঙ্গিতে। আবার নানারকম ডোরাকাটা দাগও থাকে লুঙ্গিতে। এভাবেই বিচিত্রায়ন হয়েছে লুঙ্গির।

ভারতের কেরালায় মহিলা পুরুষ উভয়েই লুঙ্গি পরিধান করে থাকেন। সাধারনত অনানুষ্ঠানিক ও দিন মজুরদের পোশাক বলে থাকেন তারা লুঙ্গিকে। সাদা রংয়ের নকশাবিহীন লুঙ্গি ‘মুন্ডু’ নামে পরিচিত সে অঞ্চলে। সৌন্দর্য বর্ধনে কখনও সোনালী রংয়ের সুতার এমব্রয়ডারি করা থাকে লুঙ্গির উপর যেটি ‘কাসাভু’ নামে পরিচিত। বিয়েতে এই লুঙ্গি বহুল ব্যবহৃত জনপ্রিয় পোশাক। জাফরান রংয়ের মুন্ডুকে ‘কাভি মুন্ডু’ বলা হয়ে থাকে।
কর্নাটকে ‘মুন্ডা’ নাম হলো রঙিন লুঙ্গির। ‘পাঞ্চে’ নামে লুঙ্গির মত সাদা রংয়ের নকশাবিহীন দুই ভাঁজের কাপড় আছে।  যেটি লুঙ্গির বিপরীতে অন্ধ্রপ্রদেশে প্রচলিত।

তামিল নাডুর ট্র‍্যাডিশনাল পোশাক source : sdeweddings

অন্যদিকে মায়ানমারে দেখা যায়, সেখানকার জাতীয় পোশাক এই লুঙ্গি যাকে স্থানীয়ভাবে ‘লোঙ্গাই’ নামে অভিহিত করা হয়। সাধারণত পুরুষেরা এটি ব্যবহার করে থাকে। অন্যদিকে মহিলাদের ব্যবহারার্থে ‘তামাইন’ নামে পরিচিত এক প্রকার লুঙ্গি পাওয়া যায়।

ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় মা’আউইস নামে লুঙ্গি সমাধিক পরিচিত। সাধারনত অবসর সময়ে তারা লুঙ্গি পরিধান করে থাকেন। নকশাবিহীন সাদা লুঙ্গিই তাদের পরিচিত ছিল কিন্তু এশিয়দের প্রভাবে এবং মশলা রপ্তানির সময় এশিয়দের সংস্পর্শে তারা রঙ্গিন লুঙ্গির সাথে পরিচিত হয়

ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় মা’আউইস নামে লুঙ্গি সমাধিক পরিচিত। সাধারনত অবসর সময়ে তারা লুঙ্গি পরিধান করে থাকেন। নকশাবিহীন সাদা লুঙ্গিই তাদের পরিচিত ছিল কিন্তু এশিয়দের প্রভাবে এবং মশলা রপ্তানির সময় এশিয়দের সংস্পর্শে তারা রঙ্গিন লুঙ্গির সাথে পরিচিত হয়।

ইয়েমেনীয় লুঙ্গি source : apogeephoto

আমদের দেশে লুঙ্গি পড়ার ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়।কেননা, এদেশে সাধারনত ধূতি আর গামছাই পোশাক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বিশ শতকের বিশের দশকে মায়ানমারের রেঙ্গুন থেকে আমদানী করা হত লুঙ্গি। ধূতিকে হিন্দুদের পোষাক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তাই সাম্প্রদায়িক মনোভাব ও সামাজিক কারনে ধূতির প্রতিদ্বন্দ্বী হতে থাকে এই লুঙ্গি। যদিও এ মনোভাব বেশিদিন টিকেনি। এখানকার হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান সর্বোপরি সকলের প্রিয় হয়ে উঠে লুঙ্গি। লুঙ্গির চাহিদা বৃদ্ধি পাবার কারণে ছোটো আকারে কিছু কারখানাও গড়ে উঠে এখানে। দেশ বিভাগের পর একসময় পূর্ব বাংলায় লুঙ্গিই হয়ে উঠে জনসাধারণের পোশাক।

বাংলাদেশী লুঙ্গির কারখানা source : internet

আমাদের দেশে সাধারনত পুরুষরাই লুঙ্গি পরিধান করে।বাসা বাড়িতে পরিধেয় হিসেবে বিবেচিত হয় এই লুঙ্গি। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার নানা আদিবাসী মেয়েরাও লুঙ্গির মতই একটি পোশাক পরিধান করে থাকেন। উল্লেখ্য, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাষানীর প্রিয় পোশাক ছিল লুঙ্গি।

লুঙ্গি পরিহিত বাংলাদেশী কিশোর source : wikipedia

এখনও আমাদের দেশে বিশেষ করে পুরান ঢাকায় ঈদের সময় পাঞ্জাবী সহযোগে লুঙ্গি বেশ শোভা পায়। পুরান ঢাকায় একরকম ঐতিহ্যের ধারক এই লুঙ্গি। আমাদের দেশে নানা প্রকার লুঙ্গির ব্র‍্যান্ড আছে তন্মধ্যে আমানত শাহ, পাকিজা, স্ট্যান্ডার্ড  উল্লেখযোগ্য।

লুঙ্গি পরিহিত বাংলাদেশী মাঝি source : wikipedia

বাংলাদেশে লুঙ্গির সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজারগুলো হলো নরসিংদীর বাবুরহাটে, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ও টাঙ্গাইলের করটিয়ার। এই বাজারগুলো থেকেই দেশের পাইকারি ব্যবসায়ীরা লুঙ্গি কিনে থাকেন এবং পরবর্তিতে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে থাকেন। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে লুঙ্গি রপ্তানীও করা হয়।

Video

Follow Me

Calendar

October 2021
M T W T F S S
« Aug    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031