Video

Follow Me

Calendar

December 2021
M T W T F S S
« Aug    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
ব্যাক্তিত্ব

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদ্যোপান্ত

চতুর্থ বাঙালি

১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার প্রচলনের পর ২০১৮ পর্যন্ত ৩ জন বাঙালি ব্যক্তিত্ব নোবেল পুরস্কার জয় করেন। চলতি বছরে অর্থনীতিতে দারিদ্র্য বিমোচনের গবেষণায় চতুর্থ বাঙালি হিসেবে নোবেল পুরস্কার পেলেন কলকাতায় জন্ম নেওয়া অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়।

১৯৯৮ সালে প্রথম বাঙালি হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল ঘরে তুলে নেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। দুর্ভিক্ষ, মানব উন্নয়ন তত্ত্ব, উন্নয়ন অর্থনীতি ও গণদারিদ্র্যের অন্তর্নিহিত কারণ বিষয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ সম্মান দেয় দ্য রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস। তার ২১ বছর পর দ্বিতীয় বাঙালি হিসেবে একই বিষয়ে নোবেল পেলেন অমর্ত্য সেনেরই ছাত্র অভিজিৎ।

বাঙালি হিসেবে সর্বপ্রথম ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেন অর্থনীতিতে এবং ২০০৬ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস শান্তিতে এই পুরস্কার জয় করেন। উল্লেখ্য, নোবেল চালুর ১১৯ বছরের ইতিহাসে এ পর্যন্ত আরও ১৩ জন বাঙালি নোবেলের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন।

২০১৯ সালে অর্থনীতিতে নোবেল জিতেছেন তিন অর্থনীতিবিদ। এর মধ্যে কলকাতায় জন্ম নেওয়া অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিজিতের সঙ্গেই নোবেল পেয়েছেন তার স্ত্রী মার্কিন অর্থনীতিবিদ এস্থার ডুফলো। তিনি ফরাসি বংশোদ্ভূত। অভিজিৎ-ডুফলো দম্পতির সঙ্গে নোবেল জেতা আরেক অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্রেমার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

কেন পেলেন নোবেল

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এস্থার ডুফলো- ঘটনাচক্রে যারা স্বামী-স্ত্রীও বটে, তারা যৌথভাবে একটি বই লিখেছেন, নাম পুওর ইকোনমিক্স। অভিজিৎ এবং এস্থার ডুফলো ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে পড়ান। নোবেল কর্তৃপক্ষ বলেছে, ‘এ বছরের নোবেল বিজেতাদের গবেষণা দুনিয়াভর দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য আমাদের শক্তি বর্ধন করেছে। মাত্র দু’দশকে তাদের নতুন গবেষণাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি উন্নয়নের অর্থনীতিতে রূপান্তর এনেছে, যা বর্তমানে গবেষণার এক উদীয়মান ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

নোবেল পুরস্কারের মুখপাত্র ব্যাখ্যা করেছেন, ‘এই অর্থনীতিবিদদের বৈশিষ্ট্য হলো, উন্নয়ন অর্থনীতির সমস্যাগুলো নিয়ে বিশেষ করে দারিদ্র্য দূরীকরণের ব্যাপারে তারা সমস্যাজনক সেইসব অংশগুলোকেও ক্ষুদ্রতর অংশে ভেঙে নিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছেন- কোনো নীতি কাজ করেছে, কোনো নীতি কাজ করেনি।’

উদাহরণ, স্কুলে যেসব শিশু যাচ্ছে তারা যথেষ্ট শিখছে না কেন। অভিজিৎরা এ বিষয়টিকে ভেঙে নিয়ে দেখতে চেয়েছেন, আর কী দেওয়া হলে, এ ব্যাপারে তাদের সাহায্য করা যায়। এক্ষেত্রে একটা জিনিস যেমন, পাঠ্যবই। কিন্তু তারা এও দেখেছেন শুধু বই দেওয়াই যথেষ্ট নয়, যদি না স্কুলগুলোকে বিনামূল্যে সংস্কারের ব্যবস্থা করা যায়।

his wife

এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ফিল্ড এক্সপেরিমেন্টের প্রয়োজন হয়েছে এবং বোঝার প্রয়োজন হয়েছে যে একটি ক্ষুদ্র নীতির উদ্যোগ গ্রহণ কার্যকরী হচ্ছে কি-না এবং যদি না হয়, তাহলে কেন তা হচ্ছে না। এই ভাবে সমস্যাকে দেখার ফলে সারা পৃথিবীতে কোন নীতি কাজ করছে এবং কোন নীতি পরিত্যাগ করা উচিত তা বোঝার ক্ষেত্রে গবেষকদের সুবিধা হয়েছে।

বিজয়ী ঘোষণার পরপরই ডুফলো বলেছেন, ‘মানুষ দরিদ্রদের উপহাসের পাত্রে পরিণত করে ফেলেছেন, তাদের সমস্যার শিকড় না বুঝেই। আমরা সমস্যা বোঝার চেষ্টা করব এবং প্রতিটি বিষয়কে বৈজ্ঞানিকভাবে এবং খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করব।’

সারা পৃথিবীর ৭০০ মিলিয়ন মানুষ, যারা প্রবল দারিদ্র্যের মধ্যে আজও দিন কাটান, তাদের জন্য কোনো রুপোর ওষুধ খোঁজেননি এবারের নোবেলবিজয়ীরা। তারা খুঁজেছেন দারিদ্র্যের বিভিন্ন দিকগুলো- যথা ভগ্নস্বাস্থ্য, অপর্যাপ্ত শিক্ষা ইত্যাদি। এর পর তারা এগুলোর প্রত্যেকটির আরও অন্দরে গিয়েছেন।

আন্দোলন করে জেলে!

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে জেলেও যেতে হয়েছিল। টানা ১০ দিন ছিলেন তিহার জেলে। সে সময়ে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন তিনি।

সাল ১৯৮৩। ছাত্র সংগঠনের সভাপতিকে বরখাস্ত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা উপাচার্যকে ঘেরাও করেছিলেন। ফলস্বরূপ তাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল।

হিন্দুস্থান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ভর্তি প্রক্রিয়া বদলানোর দাবিতে আন্দোলন হচ্ছিল। ফি এতটাই বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যে তা সামলানো গ্রামীণ এলাকা থেকে পড়তে আসা ছেলেমেয়েদের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ছাত্র সংসদ এর প্রতিবাদ করায় সংসদ সভাপতিকে বরখাস্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তখনই ছাত্র আন্দোলন আরও তীব্র হয়।’

তার কথায়, ‘সেই আন্দোলন দমন করতেই পুলিশ ঢোকে ক্যাম্পাসে। আমাদের মারতে মারতে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়।’

‘বাঙালি হিসেবে আমি গর্বিত’

নোবেল পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় অভিজিৎ বলেন, ‘নোবেল পাব ভাবিনি। একেবারে অপ্রত্যাশিত। পুরস্কার পাওয়ার পর বাবার কথাই প্রথম মনে পড়ে। বাবা থাকলে খুব ভালো লাগত। বাঙালি হিসেবে আমি গর্বিত। অমর্ত্য সেনের পর দ্বিতীয় হওয়াটা সত্যিই একটা মর্যাদার। আরও ভালো কাজ করতে চাই।’

এমআইটির এ গবেষক বলেন, ‘নোবেল পাওয়ার কথা কল্পনাতেও ছিল না। মানুষ বয়স হলে এ ধরনের পুরস্কার পায়। ৬০ বছর বয়সের পর তবু মানুষ এ ধরনের পুরস্কারের ব্যাপারে ভাবতে পারে। আমার তো সবে ৫৮ বছর। আর আমার স্ত্রী সবে ৪৭ বছর।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা খুবই ভালো হলো যে, যে পদ্ধতিতে আমরা কাজ করছি তা স্বীকৃতি পেল। প্রতিষ্ঠা পেল। যখন শুরু করেছিলাম, বারবার শুনতে হয়েছে, এটা কি অর্থনীতি? এটা করে কি কিছু শেখা যায়? কেউ বলেছেন, এত ঝামেলা করে লাভ কী? কেউ বলেছেন, এগুলো কি খেলা হচ্ছে?’

উল্লেখ্য, তার পদ্ধতিতে যারা আস্থা রাখেননি, তাদের মধ্যে তার অতি পরিচিত, অতি ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরাও ছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বাঙালি অর্থনীতিবিদরাও।

বিরোধিতা যে সর্বদা বিশেষজ্ঞ মহলে বিতর্কে আটকে ছিল, এমনও নয়। ভ্রান্ত পদ্ধতি প্রয়োগের আরোপ এসেছে, তাচ্ছিল্যের তিক্ততা বর্ষিত হয়েছে। সাক্ষ্যভিত্তিক নীতি তৈরি করার বিরুদ্ধে প্রায় জনমত তৈরি করতে নেমে পড়েছিলেন কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ। বিশেষত ভারতে একটা সমালোচনা খুবই শোনা যেত, যে দেশ এত গরিব, সেখানে দারিদ্র্য নিরসনে কোন পদ্ধতি কার্যকর হবে, তা বোঝার জন্য এত টাকা খরচ কেন? এ কি অপচয় নয়? কিন্তু অভিজিৎ ও তার সহযোগীরা বারবার বুঝিয়েছেন, কীভাবে প্রকল্প তৈরি করলে টাকাটা বাস্তবিক গরিবের কাজে লাগে, আগে তা না বুঝলে তো সবটাই অপচয়।

নোবেল পাওয়ার পর তার কথায় উঠে এলো সেই দারিদ্র্য দূরীকরণের কথা ও দেশের কথা। তার ভাষায়, ‘অনেক সময় ভোটের কথা, জনপ্রিয়তা, নাম কেনার কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা হয়। তা না করে ভারতের মতো দেশের ক্ষেত্রে যেকোনো পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে আগে ভাবনা-চিন্তা করা উচিত। কোনো সরকারি প্রকল্প রূপায়ণের ক্ষেত্রে লক্ষ রাখা উচিত, তার মাধ্যমে কীভাবে সর্বাধিক সংখ্যক দেশের মানুষ উপকৃত হতে পারেন।’

পুওর ইকোনমিক্স

অর্থনীতি বিষয়ে অভিজিতের লেখা চারটি বই বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তার মধ্যে ‘পুওর ইকোনমিক্স’ বইটি গোল্ডম্যান সাচস বিজনেস বুক সম্মানে ভূষিত হয়। এছাড়া গত ১৬ বছর ধরে তাদের গবেষণা থেকে উঠে এসেছে বেশ কিছু যুগান্তকারী চিন্তাধারা, যার সাম্প্রতিকতম ফল ২০১৯ সালে প্রকাশিত অভিজিৎ ও এস্থারের ‘হোয়াট দ্য কান্ট্রি নিডস নাও’ শীর্ষক বইটি।

২০০৮ সালে নিউইয়র্ক টাইমস সমকালীন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিবিদদের নিয়ে একটি সমীক্ষা চালায়। সেখানে দেখা যায়, সব পরিমাপেই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন অভিজিৎ, এস্থার ও তাদের চিন্তার ফসল ‘জেপ্যাল’। বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ডেভিড রোমার সেখানে বলেন, ‘বর্তমান অর্থনীতির কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দারিদ্র্যের। কেন বিশ্বের এত এত মানুষ দরিদ্র? আর অর্থনীতির এখানে আসলেই কী করণীয়? জেপ্যালের কাজের সাহায্যে এখন আমরা আস্তে আস্তে এই প্রশ্নগুলোর ধারণা পাচ্ছি।’ উল্লেখ্য, উন্নতশীল বিশ্বে দারিদ্র্য ঠেকাতে চালু রয়েছে একাধিক সহায়তা প্রকল্প। কিন্তু বাস্তবে কতটুকু সফল হচ্ছে এই প্রকল্পগুলো, তা পরীক্ষা করে জেপ্যাল।

পুওর ইকোনমিক্স গ্রন্থে অভিজিৎ ও এস্থার আক্ষেপ করেছেন, দারিদ্র্য নিয়ে বিতর্ক মূলত বৃহৎ প্রশ্নেই ঘোরাফেরা করেছে, যেমন দারিদ্র্যের চূড়ান্ত কারণ কী, মুক্ত বাজারের ওপর কতটা আস্থা রাখা উচিত, গণতন্ত্র কী দরিদ্রদের পক্ষে ভালো, বিদেশি সাহায্যের কী ভূমিকা রয়েছে- প্রভৃতি ঘিরে। অভিজিৎ, এস্থার ও ক্রেমার একসঙ্গে কাজ করছেন ৯-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে। তারা এই বড় প্রশ্নের মধ্যে আটকে থাকতে চাননি। তার বদলে তারা সমস্যাগুলোকে ভেঙে নিয়েছেন।

ভারতের বর্তমান আর্থিক অবস্থা ও মন্দা থেকে উত্তরণের পরামর্শ রয়েছে পুওর ইকোনমিক্স বইয়ে। উন্নতশীল বিশ্বে নাগরিকের খরচ প্রবণতার সহজ অথচ প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ করে ২০১১ সালে এস্থার ও অভিজিৎ রচিত এই বই সাড়া জাগিয়েছে অর্থনীতির গবেষকদের মধ্যে।

জীবনপঞ্জি

বাঙালি জাতির জন্য নতুন আনন্দের উপলক্ষ হয়ে এসেছে অর্থনীতিতে অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নোবেল প্রাপ্তি। ১০৭ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে প্রথম নোবেলের স্বাদ পায় বাঙালি। এরপর অমর্ত্য সেন আর ড. মুহাম্মদ ইউনূস হয়ে এবার তা উঠল অভিজিতের হাতে। যৌথভাবে তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী এস্থার ডুফলো ও মাইকেল ক্রেমার

১৯৬১ : কলকাতায় জন্ম

১৯৮১ : অর্থনীতিতে বি.এস ডিগ্রি অর্জন

১৯৮৩ : দিল্লির জওহরলাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম.এ ডিগ্রি

১৯৮৮ : অর্থনীতিতে পিএইচডি করার জন্য হার্ভার্ডে ভর্তি হন

২০০৪ : আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের ফেলো নির্বাচিত হন

২০০৯ : অর্থনীতির সামাজিক বিজ্ঞান ক্যাটাগরিতে ইনফোসিস পুরস্কার লাভ করেন

২০১২ : পুওর ইকোনমিকস বইয়ের জন্য এস্থার ডুফলো ও অভিজিৎ যৌথভাবে জেরাল্ড লুয়েব অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন

২০১২ : অভিজিৎ ও এস্থার ডুফলো সন্তান জন্ম দেন

২০১৩ : তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন কর্তৃক সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বিশেষজ্ঞ প্যানেলে কাজের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন

২০১৪ : কিইল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমি থেকে বার্নহার্ড-হামস পুরস্কার লাভ করেন

২০১৫ : এস্থার ডুফলোকে বিয়ে করেন অভিজিৎ

২০১৯ : এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ৩৪তম বার্ষিক সম্মেলনে সামাজিক নীতির পুনঃপ্রণয়ন বিষয়ক বক্তৃতা দেন

২০১৯ : যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হন